default-image

করোনার সংক্রমণ রোধে ১৪ এপ্রিল থেকে চলছে সর্বাত্মক লকডাউন। এ সময়ে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণে বন্ধ রাখা হয়েছে গণপরিবহন। এতে বিপাকে পড়েছেন পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত দৈনিক ভিত্তিতে পারিশ্রমিক পাওয়া শ্রমিকেরা। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় রাজধানীর কোলাহলমুখর বাস টার্মিনালগুলোতে সুনসান নীরবতা। পরিবহনশ্রমিকদের অনেকেই ফিরে গেছেন নিজ নিজ গ্রামে।

এ সময়ে কেমন আছেন পরিবহনশ্রমিকেরা? তা জানতে গত বৃহস্পতিবার মহাখালী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, টার্মিনালের প্রধান ফটকই বন্ধ। ভেতরে তেমন কেউ নেই। কয়েকজন শ্রমিকনেতা বসে আড্ডা দিচ্ছেন। দিনমজুর শ্রমিকের দেখা মিলল না সেখানে। শ্রমিকের খোঁজে তাই ছুটলাম মিরপুর ১৪। সেখানে সড়কের দুপাশে সারি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন পথে চলাচলকারী বাস। এসব গাড়ির কোনো কোনোটির সংস্কারকাজ চলছে। সেখানেও দেখা মিলল না কোনো পরিবহনশ্রমিকের।

বিজ্ঞাপন
আমরা সরকারের দিকে তাকিয়ে আছি। কিন্তু সরকারের চোখ আমাদের দিকে পড়ে না। আমাদের মতো শ্রমিকেরা যাতে হারিয়ে না যায়, সেদিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিত।
আবুল কালাম, পরিবহনশ্রমিক

পরে মিরপুর ১৪-এর সড়কে থাকা ট্রাস্ট পরিবহনের গাড়ির তদারকির দায়িত্বে থাকা মাহাবুবের সহায়তায় খোঁজ মিলল চালক আবুল কালাম আজাদের। ৩৫ বছর ধরে বাস চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। একসময় দূরপাল্লার গাড়ি চালাতেন, এখন রাজধানীর ভেতরে গাড়ি চালান। পাঁচ বছর ধরে ট্রাস্ট পরিবহনের গাড়ি চালাচ্ছেন। কথায় কথায় জানা গেল, আজাদের চার ছেলে–মেয়ের মধ্যে মেয়েটি পড়ছেন ভাষানটেক কলেজে, আর এক ছেলে পড়ছেন স্কুলে। বাকি দুজন অর্থাভাবে পড়াশোনা করতে পারেননি।

কেমন আছেন—প্রশ্ন করতেই চোখ ছলছল করে ওঠে আবুল কালামের। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললেন, ‘খুব কষ্টে দিন পার করছি। গাড়ি চালিয়েই জীবন চলত। ৩৫ বছর ধরে এটাই আমার পেশা। ৮ জনের সংসার। সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত গাড়ি চালালে ৮০০ টাকা পেতাম। এখন সরকারি বিধিনিষেধে গাড়ির চাকা বন্ধ। চাকা বন্ধ, তাই আমারও আয় নাই। খুব কষ্টে দিন চলছে।’

কথায় কথায় আবুল কালাম আরও বলেন, ‘পরিবার নিয়ে সাড়ে চার হাজার টাকা ভাড়ায় ইব্রাহিমপুরে থাকি। এখন বাসাভাড়া দিতে পারছি না, বাকি রাখছি। কোনোমতে ডাল-ভাত খেয়ে দিন পার করছি। এখন অপেক্ষায় আছি, কত দ্রুত সবকিছু স্বাভাবিক হবে। আবার গাড়ির চাকা চলা শুরু হবে, সেই আশায়।’

কারও কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে আবুল কালাম বলেন, ‘কেউ কোনো সাহায্য দেয় না। শুধু শুনি, সরকার সাহায্য দেবে। কিন্তু আশপাশে কাউকে তো পেতে দেখলাম না। গত বছরও যখন সবকিছু বন্ধ ছিল, তখনো খুব কষ্টে দিন পার করেছি। কারও কোনো সাহায্য পাইনি। সামান্য কিছু সাহায্য পাওয়ার আশায় অনেক জায়গায় কাগজপত্র জমা দিয়েছি। কিন্তু কেউ কোনো সাহায্য দিল না। এখন মনে হচ্ছে, যে টাকা খরচ করে কাগজপত্র জমা দিয়েছি, সেই টাকা খরচ করাও ঠিক হয়নি।’

কিছুটা হতাশা মোড়ানো কণ্ঠে আবুল কালাম বলেন, ‘আমরা সরকারের দিকে তাকিয়ে আছি। কিন্তু সরকারের চোখ আমাদের দিকে পড়ে না। আমাদের মতো শ্রমিকেরা যাতে হারিয়ে না যায়, সেদিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিত। মানুষই যদি না খেয়ে থাকে, তাহলে এত উন্নয়ন দিয়ে কী হবে? দেশে এত ধনী লোক, তারাও কেউ আমাদের দেখে না।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘করোনা ঠেকাতে সরকার বিধিনিষেধ দিয়েছে বুঝলাম। কিন্তু আমরা যারা দিন আনি দিন খাই, তাদের কথা কেন ভাবল না সরকার?’

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন