default-image

বাস্তবের সঙ্গে সংগতি না রেখেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়। বাস্তবতাবর্জিত লক্ষ্য ঠিক করলে কখনোই তা অর্জিত হবে না। এবারের বাজেটে যে ছোটখাটো পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা দিয়ে আগামী অর্থবছরের প্রয়োজন মেটানো যাবে না। সাত-আট বছর ধরেই রাজস্ব খাত বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব খাত বিপর্যস্ত।

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি যে হারে বাড়ছে, সে হারে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না। জিডিপি বাড়লে নতুন লোকের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা, আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। এসব বাড়লে তো শুল্ক-কর আদায় বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। হতে পারে জিডিপির গণনা ভুল, নতুবা রাজস্ব ব্যবস্থা দুর্বল। ধরে নিলাম, রাজস্ব খাতের ব্যবস্থাপনা দুর্বল। কারণ, এই খাতে যে সংস্কার করা দরকার ছিল, তা হয়নি। প্রস্তাবিত বাজেটেও রাজস্ব খাতের বড় সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। তাই রাজস্ব আদায় অতীতের মতোই হবে। বাজেটের প্রস্তাবিত রাজস্ব উদ্যোগ দিয়ে চলমান করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন মেটানো যাবে না।

গত এক দশক ধরেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। কিন্তু জিডিপির তুলনায় করের অনুপাত কমেছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ১১ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা কমে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনায় কর-জিডিপি অনুপাত এই সময়ের মধ্যে আরও ৪-৫ শতাংশ বাড়ানোর কথা ছিল। বাস্তবে তা হয়নি, বরং কমে গেছে।

করোনা পরিস্থিতির কারণে বাজেটে অর্থের জোগান দিতে রাজস্ব খাতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এবারের বাজেটে তা দেখতে পাইনি। রাজস্ব খাতে সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব আছে। এই খাতে বড় সংস্কার না হলে জিডিপি বাড়লেও রাজস্ব খাতের নিম্নমুখী প্রবণতা থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে না।

আগামী অর্থবছরে এমনিতেই বিশাল লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। করোনার কারণে সবকিছুর চাহিদা কমে যাওয়ায় আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিজেও এমন ধারণা পোষণ করে। তাই ঘাটতি থাকবে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা।

এবার আসা যাক এবারের বাজেটে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। কিছু পরিবর্তন ক্ষতিকর, আবার কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও আছে। মুঠোফোনে কথা বলার ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের খরচ বাড়িয়ে দেবে। এমনিতে টেলিযোগাযোগ খাতের ওপর সবচেয়ে বেশি করারোপ করা হয়। তাই সার্বিকভাবে এই খাতের সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। মানুষের আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাহলে কি মানুষকে বালিশের নিচে টাকা রাখতে উৎসাহিত করা হচ্ছে? আমানতের ওপর কেন শুল্ক বসানো হলো? এটা ভুল নীতি। কারণ, এই মুহূর্তে ব্যাংক খাতে আমানত দরকার। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধি করা দরকার। স্থানীয় ঋণপত্রের ক্ষেত্রেও ২ শতাংশ উৎসে কর বসানো হলো। ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য কি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে? ব্যবসায়ীরা এখন ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে গিয়ে লেনদেন করবেন।

আবার বিনিয়োগ চাঙা করার স্বার্থে কালোটাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ দেওয়া হলো। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা কোনোভাবেই কাজ করবে না। অবৈধভাবে উপার্জনকারীরা নিজেদের মুখোশ খুলবেন না। তাই তাঁরা বিদেশে টাকার পাচারের চেষ্টা করেন, সেখানেই সম্পদ রাখা বেশি নিরাপদ মনে করেন।

ভালো উদ্যোগ হলো, করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখে উন্নীত করা হয়েছে। এতে করোনাকালে নিচের দিকে থাকা করদাতারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন। অবশ্য এতে করজাল থেকে বহু করদাতা বেরিয়ে যাবেন। সিগারেটের ওপর শুল্ক বাড়ানোও ভালো উদ্যোগ। নিচের স্তরের সিগারেটে মূল্যস্তরে দুই টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে চার-পাঁচ টাকা বাড়ালে অতিরিক্ত এক হাজার কোটি টাকার মতো বাড়তি রাজস্ব আসত।

সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে গতিশীলতা নেই। আগামী অর্থবছরে বিনিয়োগও বাড়বে না, কর্মসংস্থানও হবে না। বড় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না। বাজেটের জোগানেও ঘাটতি থাকবে। করোনা সংকটের কারণে আগামী অর্থবছরেই রাজস্ব খাতে বড় সংস্কারের দরকার ছিল। এই সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে রাজস্ব খাতের সংকট আরও ঘনীভূত হবে।

আহসান এইচ মনসুর: নির্বাহী পরিচালক, পিআরআই

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0