তাঁদের চিন্তায় দামের ‘মহামারি’

করোনা মহামারির মধ্যে ঢাকায় রাইড শেয়ারিং বা শরিকি যাত্রার মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসার চলে যুবক আবদুল্লাহ আল রাশেদের। সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হতেই যাত্রী কমে গেছে। এখন দিনে তেল খরচ বাদ দিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি থাকে না, যা মাসখানেক আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।

সরকার রাইড শেয়ারিংয়ে মোটরসাইকেল চালানো নিষিদ্ধ করলেও আবদুল্লাহ আল রাশেদ নানা কায়দা-কৌশলে যাত্রী নেওয়া চালু রেখেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার কারওয়ান বাজারে যাত্রী নামিয়ে কাঁচাবাজারে ঢুকেছিলেন কিছুটা কম দামে চাল-ডাল কেনার আশায়। জানতে চাইলে বললেন, মাসে ১৫ হাজার টাকার মতো রোজগার। ৮ হাজার টাকাই যায় বাসাভাড়ায়। বাজারে চাল-তেলের যে দাম, তাতে কোনো রকমে দিন কাটছে। তাই করোনার ভয়, জরিমানার ভয়—কোনো কিছুই তাঁর রাস্তায় নামা থামাতে পারেনি।

মহামারির ধাক্কায় মানুষের আয়-রোজগারে ভাটার টান এক বছর ধরে। আর এ সময় বাজারেও যেন চলছে দামের ‘মহামারি’। যেসব পণ্য ছাড়া সংসার চলেই না, সেগুলোর দর দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাপক চড়া।

বিজ্ঞাপন

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ২০২০ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বেড়েছে, তার প্রতিবেদন এখনো দেয়নি। সাধারণত জানুয়ারির শুরুতেই তা প্রকাশিত হয়। তবে তাদের কাছ থেকে চাল, ডাল, তেল ও চিনির মূল্যবৃদ্ধির তুলনামূলক একটি চিত্র পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে মোটা চালের গড় দাম ২১ শতাংশ বেশি ছিল। একই ভাবে খোলা সয়াবিন ১৪, বোতলজাত সয়াবিন ৯, পাম তেল ১৭, চিনি ২০, মোটা দানার মসুর ৪৮ ও দেশি মসুর ডালের দাম ২৯ শতাংশ বেশি ছিল।

দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। সরকার সাত দিনের বিধিনিষেধ জারি করেছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অনেকের আয় কমেছে। কারও কারও আয় একেবারেই নেই। যেমন দূরপাল্লার বাসের শ্রমিক।

এদিকে আমদানির সুযোগ দেওয়ার পরও বাজারে চালের দাম এক টাকাও কমেনি। এখন এক কেজি মোটা চাল কিনতে লাগছে ৪৮ থেকে ৫২ টাকা। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব বলছে, গত বছরের এ সময়ের তুলনায় মোটা চালের দাম ৭ শতাংশ বেশি। এক লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেল কিনতে লাগছে ১৩৯ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেশি। প্রতি কেজি খোলা চিনির দাম ৭০ থেকে ৭২ টাকায় উঠেছে। আর প্যাকেটজাত চিনির নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৮ টাকা কেজি ।

দেশে করোনা ঠেকাতে গত সোমবার থেকে বিধিনিষেধ শুরু হওয়ার পর বাজারে ক্রেতাদের আতঙ্কের কেনাকাটা শুরু হয়। সচ্ছল ব্যক্তিরা একসঙ্গে বাড়তি পরিমাণ পণ্য কেনায় চাপ তৈরি হয়। টিসিবি বলছে, খুচরা বাজারে এক সপ্তাহে একটু ভালো মানের মোটা চালের দাম কেজিতে ৪ টাকা বেড়েছে। খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ২ থেকে ৪ টাকা বাড়তি। এর বাইরে পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও আলুর দামও বেড়েছে।

সব মিলিয়ে সীমিত আয়ের মানুষকে বাজারে গিয়ে ফর্দে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। কারও ক্ষেত্রে পরিমাণে, কারও ক্ষেত্রে পণ্যসংখ্যায়। কেউ ইলিশ বাদ দিয়ে তেলাপিয়া কিনছেন। কেউ সরু চাল বাদ দিয়ে মাঝারি চালে থিতু হয়েছেন। তাঁদেরই একজন গৃহিণী সালেহা আক্তার গতকাল কাঁটাসুর কাঁচাবাজারে যান। তিনি ১৫ কেজি চাল কিনতে চেয়েছিলেন। মাঝারি বিআর-২৮ চাল কিছুটা কম দামে কিনতে কয়েক দোকান ঘোরেন। দোকানিরা ১ টাকাও ছাড় দিতে রাজি নন। শেষ পর্যন্ত ১০ কেজি চাল কেনেন সালেহা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, হাতে ১০০০ টাকা আছে। ৫৪০ টাকাই চাল কিনতে গেল। বাকি টাকায় তেল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ ও সবজি কিনতে হবে। এই বাজারেই তাঁর ৭ সদস্যের সংসার চালাতে হবে এক সপ্তাহ।

করোনা ঠেকাতে এবারের বিধিনিষেধে বেসরকারি ত্রাণ তৎপরতা কম। ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে সরকারের চাল বিতরণও বাড়েনি। বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে টিসিবি তেল, চিনি ও ডালের দাম বাড়িয়েছে। তেল-চিনিতে কর ছাড় দেওয়ার চিন্তা এখনো বাস্তব রূপ পায়নি।

বেসরকারি সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) গত নভেম্বর ও ডিসেম্বর সময়কালে একটি গবেষণায় উঠে আসে, দেশে দারিদ্র্য বেড়ে ৪২ শতাংশে উঠেছে, যা মহামারি শুরুর আগের সরকারি হিসাবের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বললেন, করোনার মধ্যে একে তো মানুষের আয় কমেছে, তার ওপর দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষ তো খুব বেশি পণ্য কেনেন না। তাঁরা যা কেনেন, সেগুলোর দামই তো এখন বেশি।

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন