বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মাত্র ৫০০ টাকা পারিশ্রমিকে সেদিন যে প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন আলীহোসাইন আকবরআলী সেই বাংলাদেশ স্টিল রিরোলিং মিলসের (বিএসআরএম) তিনি আজ চেয়ারম্যান। তার চেয়েও বড় কথা প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি নিয়ে গেছেন এমনই এক উচ্চতায়, যা আজ হয়ে উঠেছে এ দেশের গর্ব। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেলের মতো এ দেশের উন্নয়ন-সোপানের প্রতিটি ধাপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিএসআরএমের নাম। বহুতল ভবন থেকে শুরু করে উড়ালসড়ক—কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে না বিএসআরএমের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রড। অটুট এক শক্তির প্রতীক বিএসআরএম, আর এই ইস্পাত কারখানার সক্ষমতার অবয়বটি তৈরি হয়েছে আলীহোসাইনের হাতে।

আসলে ব্যবসা ছিল তাঁর রক্তেই। পারিবারিক পরম্পরা অনুযায়ী সেই ব্যবসার হাল ধরেছিলেন তিনি। কিন্তু পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যের সঙ্গে যখন যুক্ত হলো আধুনিক শিক্ষা, তখন তা হয়ে উঠল বড় উদ্যোগের ভিত্তি। সাফল্য ধরা দিল হাতের মুঠোয়। যত সহজে বলা হলো কথাগুলো, সংগ্রাম ও সাফল্যের পথ অবশ্য তত সহজ নয়। যারা বাংলাদেশের ইস্পাতশিল্পের বিকাশ ও এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাস জানেন, তাদের অনেকেরই হয়তো জানা আছে কীভাবে দুরূহ পথ অতিক্রম করেছেন আলীহোসাইন আকবরআলী।

অবশ্য নিজের কৃতিত্বটাকে বড় করে দেখতে রাজি নন তিনি। বরং তাঁর পূর্বপুরুষদের সৃজনশীলতার কথা স্মরণ করছিলেন বারবার। পারিবারিক ব্যবসার সূচনাকালের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে তাঁর কথার যুক্তি পাওয়া গেল। আলীহোসাইনের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ভারতের গুজরাটের আম্রেলি জেলার মানুষ। দেশভাগের সময় তাঁর বাবা আকবরআলী আফ্রিকাওয়ালা ব্যবসার কাজে ছিলেন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে। ঢাকার বেঙ্গল স্টিল থেকে বিমানের স্ক্রু নিয়ে করাচিতে বিক্রি করতেন তিনি। সেই সূত্রে ১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এলেন এবং চট্টগ্রাম শহরটা ভালো লেগে গেল তাঁর। গুজরাটের সুরাট বন্দর দিয়ে বাণিজ্যের উদ্দেশে দেশ ছেড়েছিলেন যে মানুষটা, চট্টগ্রাম বন্দরে অবশেষে নোঙর ফেললেন তিনি। এখানেই থিতু হয়ে জুবিলি রোডে হার্ডওয়্যারের ব্যবসা শুরু করলেন। ব্যবসা লাভজনক হলো। কিন্তু আলীহোসাইন যে বললেন পূর্বপুরুষদের সৃজনশীলতার কথা, সেটাই যেন দেখা গেল আকবরআলী আফ্রিকাওয়ালার মধ্যে। লোহাজাত পণ্যের ব্যবসা করতে গিয়ে লাভের মুখ দেখেও এখানকার আর দশজন ব্যবসায়ীর মতো তৃপ্ত হলেন না। বরং শুধু বেচাকেনায় ব্যস্ত না থেকে উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দিলেন। লোহার পেরেক উৎপাদনের কারখানা দিলেন তিনি। আজ মনে হতে পারে সামান্য পেরেক উৎপাদনের কারখানা! কিন্তু সেই ‘সামান্য’ উদ্যোগের মধ্যেই সেদিন সুপ্ত ছিল বৃহৎ শিল্পকারখানা গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা ও সম্ভাবনা। আজ বিএসআরএম যখন উচ্চশক্তির রড তৈরিতে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলল, ইস্পাতশিল্পের ইতিহাসে উজ্জ্বল অক্ষরে খোদাই করল প্রতিষ্ঠানটির নাম, তখন সেই ‘সামান্য’ পেরেক উৎপাদন কারখানাটির কথা কিন্তু ভুলে যাওয়ার উপায় নেই।

একনজরে

বিএসআরএম

প্রতিষ্ঠাকাল

১৯৫২

কারখানার সংখ্যা

শেয়ারবাজারে নিবন্ধিত কোম্পানি

২টি

কর্মী

৫,০০০

রড উৎপাদন সক্ষমতা (বার্ষিক)

১৬ লাখ টন

বিলেট উৎপাদন সক্ষমতা (বার্ষিক)

১৮ লাখ টন

বার্ষিক লেনদেন

২০২০-২১ অর্থবছর ১২,০০০ কোটি টাকা

১৯৪৭-এর ভারত-বিভক্তির সময় পূর্ব পাকিস্তানে রড তৈরির কোনো কারখানা ছিল না। দুই বাংলার ১৮টি কারখানাই পড়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। এই অসম হিসাবটি থেকেই নতুন চিন্তা করার সুযোগ পেয়েছিলেন আকবরআলী আফ্রিকাওয়ালা। তাঁর ভাই তাহেরালী আফ্রিকাওয়ালা গেলেন কলকাতায়। ওখান থেকে আনা হলো একজন বিশেষজ্ঞ, আর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আনা হলো কিছু দক্ষ শ্রমিক। চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ এলাকায় যাত্রা শুরু করল রড তৈরির কারখানা ‘ইস্ট বেঙ্গল রিরোলিং মিলস’। সেটা ১৯৫২ সাল। বলা যায়, বাংলাদেশে ইস্পাতশিল্পের ইতিহাসের প্রথম অধ্যায় রচনা শুরু হয়েছিল সেদিন থেকেই। এভাবে পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের ইস্পাতশিল্পকে মোটামুটি একটি ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে গিয়েছিলেন আকবরআলী আফ্রিকাওয়ালা।

আশির দশকে তাঁর ছেলে আলীহোসাইন আকবরআলীর হাত ধরে ইস্পাতশিল্পের নতুন যুগে পা দিয়েছে বাংলাদেশ। ১৯৮৪ সালে ‘কোল্ড-টুইস্ট স্টিল রড’ দিয়ে এই শিল্পে পণ্যের বৈচিত্র্য শুরু হয়। এরপর ৬০ গ্রেডের রড বাজারে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ২০০৮ সাল থেকে উচ্চশক্তির রড তৈরিতে তো বিপ্লবই ঘটে গেল। এ রকম প্রতিটি বাঁকবদলের পর্বে কান্ডারির ভূমিকায় ছিলেন আলীহোসাইন। তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান এসেছে বাজারে। তারাও এখন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত বাড়ছে, গুণ ও মানেও এগিয়ে চলেছে এই শিল্প।

সত্তর ছাড়িয়ে গেছে তাঁর বয়স। এখনো সক্রিয়, কর্মতৎপর আলীহোসাইন আকবরআলী। কিছুটা বিস্ময় নিয়েই জানতে চেয়েছিলাম, ‘কী করে সম্ভব? যে বয়সে মানুষ অবসরের আলস্য নিয়ে দিন কাটায়, তখন আপনি নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন…।’

কিছুটা তৃপ্তির হাসি ফুটল তাঁর মুখে, বললেন, ‘আমি আসলে কাজপাগল মানুষ। একসময়ের পেশাটাই এখন আমার শখ হয়ে গেছে। ওপরওয়ালার কাছে আমি কৃতজ্ঞ, তিনি প্রতিটি কাজে আমার সহায় ছিলেন। হয়তো তাঁর ইচ্ছাতেই এখনো কাজ করে যেতে পারছি।’

‘আপনি তো পূর্বপুরুষের ব্যবসাকে এই জায়গায় এনে দাঁড় করালেন, আপনার ভবিষ্যৎ বংশধরেরা কি পারবে সেই ধারা বজায় রাখতে?’

‘ইনশা আল্লাহ পারবে। আসলে আমি তো এখন প্রতিদিনের কাজকর্ম দেখি না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ দিই, সিদ্ধান্ত দিই। আমার ছেলে আমের আলীহুসাইন এখন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ব্যবসায় প্রশাসনে মাস্টার্স করে একজন সাধারণ কর্মচারী হিসেবে সে এ প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছিল। ধীরে ধীরে এখানে উঠে এসেছে। আমার ভাই আছে কোম্পানির পরিচালক হিসেবে। তার ছেলে কানাডাতে এমবিএ করছে। আশা করি, সেও এসে এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেবে। মানে, আমাদের আরও একটা প্রজন্ম কিন্তু উঠে আসছে। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের একটি বড় কর্মী বাহিনী আছে। তারা নিবেদিত। আমরা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাদের কল্যাণে নানা রকম উদ্যোগ নিয়েছি। তাদের সন্তানদের জন্য স্কুল করে দিয়েছি। তারা ভালো থাকলেই তো কোম্পানি এগিয়ে যাবে।’

‘এখন ইস্পাতশিল্পে অনেকেই বিনিয়োগ করছেন, দেশের ইস্পাতশিল্পের ভবিষ্যৎ কী?’

‘সহজ একটা হিসাব…’ আলীহোসাইন বললেন, ‘প্রতিবেশী দেশ ভারতে জনপ্রতি ইস্পাতের ব্যবহার যেখানে দুই শ কেজি, সেখানে বাংলাদেশে এখনো মাত্র ৪৫ কেজি। আমরা নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছি। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে, সুতরাং রডের ব্যবহার তো বটেই, অন্যান্য মানসম্পন্ন ইস্পাত পণ্যের চাহিদাও বাড়বে। কর্মসংস্থানের বিরাট ক্ষেত্র হয়ে উঠবে এই শিল্প।’

শুধু বিএসআরএম নয়, বাংলাদেশে অনেক ভালো শিল্পোদ্যোক্তা আছে, প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা পেলে তারা দেশের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে করেন আলীহোসাইন আকবরআলী। বললেন,‘আউট অব দ্য ওয়ে কিছু চাই না, আমরা চাই সরকার আমাদের কাজটা সহজ করে দিক। আমাদের এগোতে দিলে আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব।’

কথা বললে বোঝা যায় মানুষটার স্বপ্ন যেমন আছে, স্বপ্নপূরণের প্রত্যয় আছে, ইস্পাতের মতো অটুট মনোবল আছে। বিএসআরএম তাঁর স্বপ্নের নাম, সেই স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সমৃদ্ধি।


বিশ্বজিৎ চৌধুরী: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন