default-image

ঈদের চার দিন পর কারখানা খুলেছে। সাতসকালে বাসা থেকে মুখে কিছু দিয়েই ছুটলেন জান্নাতুল ফেরদৌস। ডাকনাম জান্নাত। তবে সেদিন কারখানার ফটক পার হয়ে ভেতরে যাওয়া হলো না তাঁর। প্রশাসনের এক কর্মকর্তা কড়া ভাষায় বললেন, ‘গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাক।’

জান্নাত তখনো বুঝতে পারেননি কী ঘটতে যাচ্ছে। বারবার জানতে চাইলেন, কেন ভেতরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না? তবে উত্তর মেলেনি। প্রখর রোদে সাড়ে চার ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার পর তাঁকে জানানো হয়, ‘আর চাকরি করতে পারবা না।’ হঠাৎ জান্নাতের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।

বাকি ঘটনা জান্নাতের মুখেই শুনুন। ‘কাজে যেতে আমি কখনো ১০ মিনিট দেরি করি নাই। বেশির ভাগ সময়ই আগে চলে যেতাম। কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার দোষ কী? জবাব দেয় না। সাদা কাগজে স্বাক্ষর দিতে বলে। আমি অস্বীকার করি। পরে আমার কাছ থেকে জোর করে স্বাক্ষর নিয়ে চলে যেতে বলে। অনেক কান্নাকাটি করলাম, কিন্তু কোনো কথাই শুনল না।’

গাজীপুরের শ্রীপুরের এমএইচসি অ্যাপারেলস লিমিটেডে দুই বছর ধরে সুইং অপারেটরের কাজ করতেন জান্নাত। গত ২৭ মে সেখান থেকেই তাঁকে ছাঁটাই করা হয়। তারপর তিন-চারটি কারখানায় গেলেও কাজ পাননি। বাধ্য হয়ে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান। গতকাল বুধবার দুপুরে মুঠোফোনে যখন কথা হয়, তখনো তিনি গ্রামের বাবার বাড়িতে।

ছয় বছর বয়সে জান্নাতের মা মারা যান। পরে তাঁর বাবা আবার বিয়ে করেন। সৎমায়ের সংসারেই বড় হয়েছেন। সংসারের টানাটানির কারণে বছর পাঁচেক আগে পোশাক কারখানায় কাজ নেন। বাড়িতে ছোট দুই ভাইবোন আছে। করোনার কারণে বাবার ছোট কাঠের ব্যবসাও কয়েক মাস ধরে বন্ধ। 

পোশাক কারখানায় কাজ করে মাসে গড়ে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় হতো জান্নাতের। এর মধ্যে ২ হাজার টাকা নিজে ঘরভাড়া দিতেন। খাবার খরচ ছিল ৩ হাজার টাকা। বাকি টাকা বাড়িতে পাঠাতেন। বলতে বলতে কান্নায় জড়িয়ে যায় জান্নাতের কণ্ঠ। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলেন, ‘চাকরিটাই ছিল সম্বল। এখন দুই বেলা ভাত জুটবে কীভাবে? কতজনকে বলতেছি একটা কাজ দিতে। বাসাবাড়ির কাজ হলেও আমার করতে কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু কেউ কাজ দিচ্ছে না।’

জান্নাতের মতো হাজার হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শিকার হচ্ছেন পোশাকশিল্পে। প্রায় প্রতিদিনই সংখ্যাটি দীর্ঘ হচ্ছে। সরকারের তরফ থেকে অনুরোধ করেও থামানো যাচ্ছে না। করোনায় ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হওয়ার জেরে গত এপ্রিল থেকেই ছাঁটাই চলছে। ঈদের আগে শ্রমিক ছাঁটাই না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রক্ষা করেননি পোশাকশিল্পের মালিকেরা।

>করোনায় ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হওয়ার জেরে গত এপ্রিল থেকেই পোশাকশিল্পে ছাঁটাই চলছে। বেকার হচ্ছেন বহু শ্রমিক।

গত সোমবার শ্রম মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) জানিয়েছে, প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। সংখ্যাটি অনেক বেশি দাবি করে শ্রমিকনেতারা বলছেন, শ্রমিকেরা অনেক ক্ষেত্রেই ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না। পেলেও কম পাচ্ছেন। কথাটি যে মিথ্যা নয়, তা জান্নাতের সঙ্গে কথা বলেও পরিষ্কার হলো। এমএইচসি অ্যাপারেলস তাঁকে মে মাসের মজুরি দিলেও কোনো রকম ক্ষতিপূরণ দেয়নি।

১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে ৩ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিলেন দেশের উদ্যোক্তারা। গত অর্থবছর সেটি বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ডলার। অনেকটা শূন্য থেকে শুরু করেও বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। উদ্যোক্তারা স্বীকার করেন, শ্রমিকদের শ্রম আর ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে পোশাকশিল্প। অথচ করোনার কঠিন সময়ে অনেক উদ্যোক্তাই শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন না। 

গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার বললেন, ছাঁটাইয়ের শিকার শ্রমিকেরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অনেকে গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন। তবে যাঁদের চাকরি আছে, তাঁরাও ভালো নেই। সবার মনেই ছাঁটাই-আতঙ্ক।

করোনা সংকটের শুরুর দিকেই শ্রমিকদের তিন মাসের মজুরি দিতে সরকার পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করে। সদ্য ঘোষিত ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল পোশাক খাতের করপোরেট কর দুই বছরের জন্য ১০ থেকে ১২ শতাংশ বহাল রাখার সুপারিশ করেন। এমনকি পোশাক রপ্তানির বিপরীতে ১ শতাংশ নগদ সহায়তাও আসছে বছর অব্যাহত থাকবে। মালিকদের সুবিধা দিলেও পোশাকশ্রমিকদের কথা মনে পড়েনি অর্থমন্ত্রীর।

সরকার মালিকদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করলেও মালিকেরা শ্রমিকদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করছেন না বলে অভিযোগ করলেন শ্রমিকনেতা সিরাজুল ইসলাম। তিনি বললেন, সরকার মালিকদের নানাভাবে সহায়তা দিলেও শ্রমিকের দুর্দশা কমছে না।

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন