করোনার কারণে গত দুই বছর ঈদকে কেন্দ্র করে তেমন ব্যবসা করতে পারেননি উর্দু রোডের ব্যবসায়ীরা। করোনার বিধিনিষেধের কারণে গত দুই বছর উৎপাদনও নেমে এসেছিল স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অর্ধেকে। তা–ও বড় অংশ অবিক্রীত ছিল। করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় এ বছর ঈদকে কেন্দ্র করে ব্যবসার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে উৎপাদন বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে ভালো বিক্রি হলেও রোজা শুরুর পর বিক্রি অনেক কমে গেছে।

এখানকার ব্যবসায়ীরা জানান, উর্দু রোডের পাইকারি ব্যবসা মূলত শবে বরাতের পর থেকে শুরু হয়। আর ১০ রোজার মধ্যেই ৯০ শতাংশ বিক্রি শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। এখন পর্যন্ত ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পোশাক বিক্রি হয়েছে।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, উর্দু রোডের অধিকাংশ দোকানে ক্রেতাদের তেমন ভিড় ছিল না। ব্যবসায়ীরা জানান, শবে বরাতের পর থেকে গত এক মাসে উৎপাদিত পোশাকের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিক্রি করতে পেরেছেন। বিক্রি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা মানুষের আর্থিক সংকট ও হঠাৎ করে নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিকে দায়ী করেছেন।

উর্দু রোডের খানদানি পাঞ্জাবির দোকানের স্বত্বাধিকারী মামুনুর রশীদ জানান, শবে বরাতের এক–দেড় মাস আগে থেকে শুরু হয় এখানকার পণ্য প্রস্তুতি। আর শবে বরাতের ১০ থেকে ১৫ দিন আগেই দোকানে নতুন পোশাক তোলা হয়। ১০ থেকে ১৫ রোজার মধ্যেই ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পণ্য বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বিক্রি কম। এ কারণে এ বছর নগদ টাকায় বিক্রির কৌশল নিয়েছেন অধিকাংশ ব্যবসায়ী।

রাজধানীর পুরান ঢাকার সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশেই মাওলানা মুফতি দ্বীন মোহাম্মদ সড়ক, যা উর্দু রোড নামেই বেশি পরিচিত। স্বাধীনতার বছর দশেক পরে এখানে শুরু হয় পোশাকের পাইকারি ব্যবসা। চার দশকে চার শতাধিক পোশাকের পাইকারি দোকান গড়ে উঠেছে এ এলাকায়। এর মধ্যে পাঞ্জাবি ও শার্টের দোকানই দেড় শতাধিক, বাকিগুলোতে বিক্রি হয় নারী ও ছোটদের পোশাক।

দেশে পোশাকের পাইকারি বাজারগুলোর মধ্যে উর্দু রোড অন্যতম। এখানকার ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগেরই আছে নিজস্ব কারখানা। দেশ ও দেশের বাইরে থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে এসব কারখানায় তৈরি করা হয় নানা রঙের ও নকশার পোশাক।

উর্দু রোডের দোকানগুলোতে শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, পায়জামা, কটি এবং নারী ও শিশুদের বিভিন্ন পোশাক পাইকারিতে বিক্রি হয়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বিপণিবিতান ও দোকানের পাশাপাশি এসব পোশাক যায় সারা দেশে। মূলত দেশের বিভিন্ন এলাকার খুচরা ব্যবসায়ীরা এখান থেকে পাইকারি দরে পোশাক কিনে নিয়ে যান। আকার ও নকশাভেদে পোশাকের দাম ৬০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত।

উর্দু রোড অভ্যন্তরীণ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম এইচ মোস্তফা বলেন, ঢাকার কয়েকটি স্থানে পাইকারি পোশাক বিক্রি হলেও মানসম্মত পণ্যের জন্য সবার পছন্দের জায়গা উর্দু রোড। সারা দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা এখান থেকে পণ্য কিনতে আসেন।

এম এইচ মোস্তফা জানান, স্বাভাবিক মৌসুমের সময় উর্দু রোডে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হয়। সেই হিসাবে মাসে ১০০ কোটি টাকার বেশি পণ্য বেচাকেনা হয় এই উর্দু রোডে।

পোশাকের দোকান ছাড়াও এখানে রয়েছে পোশাকের বিভিন্ন উপকরণ বিক্রির দোকানও। উর্দু রোডের রংধনু স্টোরে বিভিন্ন প্রকারের সুতা বিক্রি হয়। এই দোকানের বিক্রয়কর্মী রিফাত হোসেন বলেন, সারা বছর ধরে ব্যবসা চললেও তাঁদের বছরের ব্যবসার সিংহভাগ হয় ঈদকে কেন্দ্র করে।

আশানুরূপ বিক্রি হচ্ছে না

এখানকার ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘করোনার আগে স্বাভাবিক সময়ে ৩৫ হাজার পিসের মতো পোশাক বানাতাম। করোনার কারণে সেই উৎপাদন কমে অর্ধেকে নেমে গিয়েছিল। তারপরও উৎপাদিত পণ্যের বড় অংশ অবিক্রীত ছিল। এ বছর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক মনে হওয়ায় ২৫ হাজার পিস বিভিন্ন ধরনের পোশাক বানিয়েছি। কিন্তু বিক্রি আশানুরূপ হচ্ছে না।’

আরেক ব্যবসায়ী জেরিন স্টাইলের স্বত্বাধিকারী কামরান হোসাইন জানান, স্বাভাবিক সময়ে ঈদকে কেন্দ্র করে ৩০ থেকে ৪০ হাজার পোশাক বানাতেন তিনি। এ বছর এখন পর্যন্ত সাড়ে আট হাজার পোশাক সেলাই করেছেন। আগের রয়ে যাওয়া পণ্য আছে ২০ হাজারের মতো। কিন্তু সব মিলিয়ে বিক্রি হয়েছে পাঁচ হাজার পোশাক।

আরিফ হোসেন করোনার আগে চাকরি করতেন একটি পোশাক কারখানায়। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে গত বছর উর্দু রোডে ছোট্ট একটি দোকান ভাড়া নেন তিনি। এ রকম বেশ কিছু নতুন দোকান যুক্ত হয়েছে এ বাজারে। আবার করোনার ধাক্কা সামাল দিতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন অনেকে।

ব্যবসায়ী নেতা এম এইচ মোস্তফা জানান, করোনার সময় ক্ষতি পোষাতে না পেরে এখানকার ৮ থেকে ১০ জন ব্যবসায়ী ব্যবসা গুটিয়ে নেন। এ বছর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় সবার আশা ছিল কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত যে অবস্থা, তাতে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ঈদের পর হয়তো আরও কয়েকজনকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হবে।

তবে বেশির ভাগ ব্যবসায়ী ভালো ব্যবসা করতে না পারলেও হাতে গোনা কিছু দোকান ভালো ব্যবসা করেছে। তাদেরই একটি ফাইজা পাঞ্জাবি ফ্যাশন। প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয়কর্মী মাসুম রানা জানান, ঈদ উপলক্ষে বিক্রির জন্য দোকানে তোলা সব শার্ট ইতিমধ্যে তাঁরা বিক্রি করে ফেলেছেন।

তবু আশা

খানদানি পাঞ্জাবির স্বত্বাধিকারী মামুনুর রশীদ জানান, গত দুই বছরে কাঁচামালসহ পাঁচ–ছয় কোটি টাকার পণ্য অবিক্রীত পড়ে ছিল। এবার সেগুলো বিক্রি হচ্ছে। সঙ্গে নতুন কিছু মডেলের পণ্যও দোকানে তুলেছেন। এখন পর্যন্ত ৭০ শতাংশ পণ্য বিক্রি হয়েছে। বাকি ৩০ শতাংশ পণ্য ঈদের আগে বিক্রি হয়ে যাবে বলে আশা তাঁর। আর সেটি হলে গত দুই বছরের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে জানান মামুনুর রশীদ।

মামুন আরও বলেন, এমনিতে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন ভালো নয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিত্যপণ্য মূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। খেয়ে–পরে চলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেক মানুষকে। এ কারণে খুচরা বাজারে পোশাকের বিক্রি কম। যার প্রভাব পড়েছে উর্দু রোডের পাইকারি ব্যবসাতেও।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন