এদিকে সরকার দেড় মাস পর গতকাল বৃহস্পতিবার ঠিকই বিশ্ববাজারের সঙ্গে ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয় করেছে। তবে একবারেই প্রতি কেজি বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৩৮ থেকে ৪৪ টাকা পর্যন্ত বাড়াতে হয়েছে। অথচ বিশ্ববাজারের অস্থিরতা মেনে নিয়ে রোজার আগে থেকে দফায় দফায় দাম সমন্বয় করা হলে সরবরাহে এত বড় সংকট যেমন দেখা দিত না, তেমনি একবারে ৩৮ থেকে ৪৪ টাকাও বাড়াতে হতো না।

ভোজ্যতেলের দাম সহনীয় রাখতে সরকার অবশ্য অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) প্রত্যাহার করেছে। আমদানিতে কর কমিয়েছে। বাজারেও তদারকি বাড়িয়েছে। কিন্তু আমদানি যে দিন দিন কমছে তা হয়তো বিবেচনায় নেয়নি। উল্টো সংকটের সময়ে সরকারি তদারকি সংস্থাগুলো সাত–আট মাসের পুরোনো আমদানি তথ্য দিয়ে দেশে সয়াবিন তেল পর্যাপ্ত মজুত থাকার ‘ভুল’ তথ্য পরিবেশন করেছে।

সংকটের শুরু থেকে ঋণপত্র (এলসি) খোলার হার ও আমদানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে কি না, সেদিকে সরকারের বড় নজরদারির দরকার ছিল। সেই সঙ্গে বিশ্ববাজার পর্যবেক্ষণ করে ব্যবসায়ীদের অভয় দেওয়া যেত, যাতে তাঁরা আমদানি স্বাভাবিক রাখেন। প্রয়োজনে বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ভোজ্যতেল আমদানি করিয়ে সরকারি সংস্থা সংগ্রহ করতে পারত। এর আগে পেঁয়াজ–সংকটের সময়ে সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপে খুব সহজে বাজার স্বাভাবিক হয়েছিল।

এদিকে রোজার আগে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সয়াবিন তেল সংগ্রহ করা হয়েছে। তাতে বাজারে সরবরাহ বাড়েনি। উল্টো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে যে তেল সরবরাহের জন্য রেখেছিল, তা ব্যাহত হয়েছে। সরকারি সংস্থার মাধ্যমে সয়াবিন তেল আমদানি করা হলে বাজারে সরবরাহ বাড়ত। বাজার সহনীয় রাখতে সরকার ভোজ্যতেলের দাম বেঁধে দেয়। এতে কোনো কাজ হয়নি। কারণ, ব্যবসায়ীরা আমদানি স্বাভাবিক রাখেননি।

ভোজ্যতেলের দাম ও সরবরাহে অস্থিরতা হঠাৎ শুরু হয়নি। করোনা কাটিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করার পরিস্থিতিতে নিত্যপণ্যের দাম ২০২০ সালের শেষ দিক থেকে বাড়তে থাকে। ২০২১ সালে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম জোরদার হয়। এতে দেশে দেশে চাহিদা বাড়তে থাকে। এর প্রভাব পড়ে শিল্পের কাঁচামাল থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যে।

গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক পণ্যবাজারে অস্বাভাবিক উত্থান হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি সংস্থার হিসাবে, এ দুটি দেশ বিশ্বে সূর্যমুখী তেলের এক–তৃতীয়াংশ জোগান দিত। সূর্যমুখী তেলের সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় চাপ পড়ে প্রধান দুটি ভোজ্যতেল পাম ও সয়াবিনের ওপর। এ ছাড়া দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে খরায় সয়াবিনের উৎপাদন কম হয়েছে এবার। এমন অবস্থায় ইন্দোনেশিয়া পাম তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। তাতে ভোজ্যতেলের বাজার আরও অস্থির হয়।

বিশ্বব্যাংকের গত ২৬ এপ্রিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগে পাম ও সয়াবিন তেলের দাম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না। সংস্থাটি সম্ভাব্য যে দামের আভাস দিয়েছে সেটিও হতে পারে ইতিহাসের সর্বোচ্চ। বিশ্বব্যাংকের পূর্ভাবাসের দুদিন পর ইন্দোনেশিয়া পাম তেল রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেয়। এরপরই বিশ্ববাজারে পণ্যটির মূল্যবৃদ্ধির নতুন রেকর্ড হয়।

এর আগে ২০০৮ সালে বৈশ্বিক মন্দা শুরুর আগে বিশ্ববাজারে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সে বছরের এপ্রিলে মন্দা শুরুর পর দরপতন শুরু হয়। এমনকি মন্দার প্রভাবে এক মাসেই লিটারে দাম কমে প্রায় ১৬ টাকা। আর ৪ মাসের ব্যবধানে দাম কমে ৫০ শতাংশ। ফলে বিশ্ববাজার থেকে সয়াবিন ও পাম তেল কিনে দেশে আনার পর লোকসানে পড়েন দেশের ব্যবসায়ীরা।

মন্দা কাটিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর পর ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দামে আরেক দফা উত্থান ঘটে। যথারীতি ২০১২ সালের শেষে আবারও দরপতন শুরু হলে ব্যবসায়ীরা ধাক্কা খান। এই দুই ধাক্কা সামলাতে না পেরে চট্টগ্রামের বড় কয়েকটি গ্রুপকে বাজার থেকে সরে যেতে হয়েছে।

২০০৮ ও ২০১২ সালের ধাক্কা লেগেছে সিটি ও মেঘনার মতো শিল্প গ্রুপের ওপর। তবে তাদের আরও ব্যবসা থাকায় ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। অবশ্য ব্যাংকও সহযোগিতা করেছে। ব্যবসায়ীদের সে কথা মনে আছে। তাঁরা আগের সেই দুঃসহ পরিস্থিতি ফিরে আসুক, এটা নিশ্চয়ই চান না। সে জন্যই তাঁরা সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন।

এখন মুঠোফোনের মাধ্যমেই পুরো পৃথিবীর সবকিছু জানা যায়। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে বসে যুক্তরাষ্ট্রের কমোডিটি এক্সচেঞ্জ তথা পণ্য বেচাকেনার বাজার শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডের (সিবিওটি) উত্থান–পতনের তথ্য সহজেই জানা যায়। বিশ্ববাজারের ওই তথ্য দেখতে দেখতে ঠিক হয়ে যায় এদেশে দাম কত হবে। আবার বিশ্ববাজার ঠিক হয় বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর। যুক্তিসংগতভাবে মূল্য সমন্বয় না করে বাজার তদারকি করে যে সুফল আসবে না তা এবার দেখা গেছে। সরবরাহ যাতে স্বাভাবিক থাকে, সেটিই সরকারের তদারকি করা দরকার। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে কেউ অস্বাভাবিক হারে দাম বাড়াতে পারবেন না। প্রয়োজনে সরকার নিজেও আমদানি করে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পারে।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন