মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার সঠিকভাবে বাজার ব্যবস্থাপনা ও তদারকি করতে পারছে না বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো এস এম জুলফিকার আলী। তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা ওপর থেকে কী সিগন্যাল দিচ্ছেন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। যদি এভাবে বলা হয় যে অনিয়ম করে কেউ পার পাবে না, তাহলে কিন্তু সমস্যা অর্ধেক কমে যাবে। এ ছাড়া নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়ের পরামর্শ দেন তিনি।

টিসিবির খাদ্যসহায়তা নিয়ে জুলফিকার আলী বলেন, এসব উদ্যোগ ভালো হলেও তা বাজারব্যবস্থার পরিপূরক কোনো ব্যবস্থা নয়। তাই ন্যূনতম জীবনমান বজায় রেখে যাতে দরিদ্র জনগণ চলতে পারে, সরকারকে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বর্তমানে যা দেখছি, সেগুলো বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার উপসর্গ। উন্নয়নশীল দেশের বাজারব্যবস্থার সঙ্গে এসব সংগতিপূর্ণ নয়, বরং সাংঘর্ষিক। এতে ভোক্তা ও উৎপাদক কারও স্বার্থই রক্ষা হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক একটা সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে সবাই নিবন্ধন নিয়ে ব্যবসা করবেন। নিয়মের ব্যত্যয় হলে তা ধরার জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকবে। এতে ব্যবসায়ীরা মুনাফা করবেন, ভোক্তারাও ভালো থাকবেন।

বাজার পর্যবেক্ষণে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন সানেমের গবেষণা পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সায়েমা হক বিদিশা। তিনি বলেন, টিসিবির বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ আছে। তাদেরও সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সায়েমা হক খাদ্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক প্রত্যাহার, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো, দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকাগুলোর ওপর বিশেষ নজর দেওয়া ও মাথাপিছু বরাদ্দ বাড়ানোর সুপারিশ করেন।

দেশে খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেন ওয়েবিনারের সভাপতি এবং খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। তিনি বলেন, একসময় পাটের দাম বেঁধে দেওয়া হতো, কিন্তু তাতে দাম নিয়ন্ত্রণে আসত না। এত বড় বাজার, তাই ইচ্ছা থাকলেও সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। এ জন্য সবার মধ্যে মূল্যবোধ তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কার মতো অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে কি না, সেই সম্পর্কে কাজী খলীকুজ্জমান বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার তুলনা একেবারেই অবান্তর। এটা করলে শুধু আতঙ্কা ছড়ানো হবে। তবে ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক থাকতে হবে।

খাদ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে রাস্তায় চাঁদাবাজি হওয়াটা একটি বড় সমস্যা বলে জানান খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি এস এম নাজের হোসেন। তিনি মনে করেন, চাঁদাবাজির চেয়েও বড় সমস্যা হলো ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফার প্রবৃত্তি।

মূল প্রবন্ধে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মহসিন আলী বলেন, দেশে উল্লেখযোগ্য হারে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয় মেলাতে না পেরে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ এখন কম দামে পণ্য পেতে টিসিবির লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে। রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত থেকে এই কার্ডের সংখ্যা বাড়িয়ে ২ কোটি করার পরামর্শ দেন তিনি।

মহসিন আলী বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, সাধারণ মানুষের জন্য আয় বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি এবং কিছু পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি আগাম আমদানির ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেন।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ অটো রাইস মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খোরশেদ আলম খান, খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের সমন্বয়কারী কানিজ ফাতেমা ও চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি এস এম নাজের হোসেন।