প্রথম আলো: ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নরসিংদী জেলার বর্তমান পরিস্থিতি কী?

আবদুল্লাহ আল মামুন: এই জেলার ব্যবসা-বাণিজ্য মূলত দুটি খাতের ওপর নির্ভরশীল। এর একটি টেক্সটাইল বা বস্ত্রশিল্প, অন্যটি কৃষি খাত। তবে একসময় এই জেলা ছিল ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় সমস্যাগুলো সমাধান করে এসব খাতের আধুনিকায়ন করতে পারলে আগামী দিনে নরসিংদী হয়ে উঠবে দেশের একটি অন্যতম শিল্পনির্ভর জেলা।

প্রথম আলো: এই জেলায় টেক্সটাইল, মানে বস্ত্র খাতে ব্যবসার অবস্থা কেমন?

আবদুল্লাহ আল মামুন: গত দুই বছরে করোনার অভিঘাতে এই জেলার টেক্সটাইল বা বস্ত্রশিল্প একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়েছিল। অবশেষে এবারের ঈদ উপলক্ষে টেক্সটাইল শিল্পমালিকেরা আশা করেছিলেন, ব্যবসার উন্নতি হবে, মানুষ আবার বাজারমুখী হবেন। কিন্তু সুতার মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীরা আশানুরূপ বেচাকেনা করতে পারেননি। প্রান্তিক পর্যায়ের তাঁতিদেরও পুঁজির সংকটের কারণে পণ্য উৎপাদন কম হয়েছে। এ ছাড়া গ্যাস–সংকটের কারণে ডাইং কারখানাগুলোও সেভাবে চালানো যায়নি। এ কারণে প্রোডাকশনও হ্যাম্পার (বাধাগ্রস্ত) হয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য আশানুরূপ হয়নি।

প্রথম আলো: এই জেলায় ব্যবসা-বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেমন?

আবদুল্লাহ আল মামুন: ভৌগোলিকভাবে নরসিংদী দেশের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অবস্থিত। এখান থেকে দেশের যেকোনো প্রান্তে যোগাযোগব্যবস্থা ভালো। নরসিংদী থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় সড়ক, নৌ ও রেলপথে যোগাযোগের ব্যবস্থা রয়েছে। এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে এখানে আরও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বাড়ানোর সুযোগ আছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এই সুযোগ কাজেও লাগাচ্ছেন। যদি আমরা সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারি, তাহলে আগামী দিনে এই জেলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও জোরদার হবে।

প্রথম আলো: এই জেলায় ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কী কী সমস্যা রয়েছে?

আবদুল্লাহ আল মামুন: সারা দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা বিদ্যমান, সেগুলো নরসিংদীতেও আছে। এত বড় একটি শিল্পাঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও এই জেলায় কিন্তু ইপিজেড বা এসইজেড গড়ে ওঠেনি। সরকারের পক্ষ থেকে যদি এখানে একটি পরিকল্পিত শিল্পনগর গড়ে তোলা যেত, তাহলে কিন্তু এই জেলায় আরও ব্যাপকভাবে শিল্পের প্রসার ঘটত। এর মাধ্যমে জেলার বেকার তরুণ ও যুবকদের কর্মসংস্থানও বাড়ত।

প্রথম আলো: নরসিংদীতে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা কেমন?

আবদুল্লাহ আল মামুন: এই জেলায় ব্যবসা-বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে শিল্পে সমৃদ্ধ হয়েছে যেসব জেলা, তার মধ্যে নরসিংদী অন্যতম। নরসিংদীতে কৃষিপণ্য, বিশেষ করে সবজি, মাছ ও ফলের ব্যাপক আবাদ হয়। এসব কৃষিপণ্য এই জেলার চাহিদা মিটিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে ব্যাপক পরিকল্পনা নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নে জোর দিতে পারলে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা আরও বাড়বে।

প্রথম আলো: এখানে কোন খাতের ব্যবসা ভালো করছে?

আবদুল্লাহ আল মামুন: নরসিংদীতে টেক্সটাইল শিল্পই বেশি ভালো করছে, আরও ভালো করবে। এ ছাড়া কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পগুলোরও ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। সম্প্রতি এই জেলায় ইলেকট্রিক অ্যাপ্লায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিগুলোও ভালো করছে। ভৌগোলিক অবস্থান ভালো হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে আরও শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখানে ব্যবসা করতে আসবে।

প্রথম আলো: নরসিংদী জেলায় কত শিল্পকারখানা আছে?

আবদুল্লাহ আল মামুন: এই জেলায় ঠিক কতগুলো শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তার প্রকৃত হিসাব সরকারের কলকারখানা অধিদপ্তর বলতে পারবে। তবে আমাদের ব্যবসায়ীদের হিসাবে হাজারের বেশি শিল্পকারখানা চালু রয়েছে এই জেলায়। এসব শিল্পকারখানায় কয়েক লাখ শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন।

প্রথম আলো: এখানে নতুন শিল্পকারখানা নির্মাণে কী কী বাধা আছে?

আবদুল্লাহ আল মামুন: নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনে অন্যতম বাধা হচ্ছে ইউটিলিটি কানেকশন (গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ)। অনেক শিল্পোদ্যোক্তা আমাকে জানিয়েছেন, ইউটিলিটি কানেকশন না পাওয়ার কারণে তাঁরা নতুন ব্যবসা স্থাপন বা সম্প্রসারণ করতে পারছেন না। বিশেষভাবে নতুন করে গ্যাস–সংযোগ পাওয়ার ব্যাপারে ব্যাপক জটিলতা রয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক লোন পাওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জটিলতা পোহাতে হয়। এ ক্ষেত্রে সরকারি নিয়মনীতি একটু সফট (নমনীয়) হওয়া উচিত।

প্রথম আলো: সমস্যা ও সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে নরসিংদী জেলার সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সমৃদ্ধি বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

আবদুল্লাহ আল মামুন: স্থানীয় সমস্যা যা আছে, তা পাশ কাটিয়েই তো ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যেতে হবে। সারা দেশেও এসব প্রতিবন্ধকতা পার হয়েই ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হচ্ছে। এভাবেই সম্ভাবনা তৈরি হয়। যদি একটু পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতি-সহায়তা পাওয়া যায়, তবে নরসিংদী আগামী দিনে দেশের একটি অন্যতম শিল্পনির্ভর জেলা হয়ে উঠতে পারবে।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন