বেচাকেনা না থাকায় ধস নেমে এসেছে দেশের অন্যতম পাইকারি কাপড়ের মোকাম নরসিংদীর শেখেরচর-বাবুরহাটে। অবরোধ-হরতালের কারণে পাঁচ সপ্তাহ ধরে এই হাটে পাইকারি ক্রেতারা আসতে না পারায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বর্তমানে হাটের সাপ্তাহিক লেনদেন কমেছে ৯০ শতাংশের মতো।
সম্প্রতি বাবুরহাটে গিয়ে অল্পসংখ্যক মানুষের চলাচল আর দুই-একজন ক্রেতার উপস্থিতি দেখা গেছে। যানজট, পণ্য ওঠানো-নামানো, ক্রেতার ভিড়, বিক্রেতার ব্যস্ততা এসব মিলে বাজারের চিরচেনা যে রূপ তার ছিটেফোঁটাও যেন নেই। বিক্রেতাদের কেউ ঘুমাচ্ছেন, কেউ সংবাদপত্র পড়ছেন, আবার কেউ আড্ডা দিয়ে সময় কাটাচ্ছেন।
হাটের ভেতরে একটি দোকানে কথা হয় কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে আসা পাইকারি ক্রেতা আবদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঘর থেইকা বাইর হইতেই ভয় লাগে। অবরোধের কারণে যেভাবে চারদিকে পেট্রলবোমা, গাড়িতে আগুন আর ভাঙচুর করা হচ্ছে। এর মধ্যে সুস্থভাবে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর লাশ হয়ে কিংবা পোড়া শরীর নিয়ে ফিরতে হবে না, এটার নিশ্চয়তা কে দেবে। তাই বাজারে আসতে ইচ্ছা করে না।’
শেখেরচর-বাবুরহাট বণিক সমিতি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা এই মোকামে ছোট-বড় প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি দোকান রয়েছে। এখানে মাথার টুপি থেকে শুরু করে শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, পাঞ্জাবি, থ্রিপিস, শার্ট-প্যান্ট, বিছানার চাদর, মশারি, থান কাপড়সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের দেশীয় কাপড় পাওয়া যায়। পাশাপাশি এই হাটে আসা কোনো ক্রেতাকে কোনো প্রকার চাঁদা দিতে হয় না। তাই প্রতি শুক্র ও শনিবার হাটবারে রাজশাহী, বগুড়া, সিলেট, বরিশাল, জামালপুর, ভোলা, সিরাজগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জসহ দেশের নানা প্রান্তের পাইকারি ক্রেতাদের ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠে বাজারটি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পাঁচ সপ্তাহ ধরে মন্দাভাব বিরাজ করছে দেশের সর্ববৃহৎ পাইকারি এই বাজারটিতে। আশানুরূপ ক্রেতা না পাওয়ায় বেচাকেনায় নেমে এসেছে ধস। চলমান এ অবস্থার কারণে দিনের পর দিন বসে বসে অলস সময় পার করতে হচ্ছে তাঁদের।
আর-টেক্স শাড়ি ঘরের মালিক শেখ মোহাম্মদ রুমন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানুষের চাহিদাই মনে হয় কমে গেছে। অনেক দিন ধরেই ব্যবসায় মন্দা চলছে। তার পরও প্রতি মাসে (গত ছয় মাস) গড়ে ৫০-৭০ হাজার পিচ শাড়ি বিক্রি হতো। আর জানুয়ারি মাসে অবরোধের মধ্যে সব মিলিয়ে বিক্রি ১০ হাজার। এখন বুঝে নেন আমরা কোন অবস্থায় আছি। বেচাকেনা না থাকলেও তো দোকান খুলে বসে থাকতে হচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও বেতন গুনতে হচ্ছে।’
শেখেরচর-বাবুরহাট বণিক সমিতির সহসভাপতি ও ইজারাদার অাবদুল বাকির বলেন, প্রতি শুক্র ও শনিবার—সপ্তাহের এই দুই দিনে এখানে কমপক্ষে ৭০০ কোটি টাকা বেচাকেনা হয়। তবে অবরোধের কারণে বেচাকেনা নেমে এসেছে ১০ ভাগের ১ ভাগে। বাধ্য হয়ে অনেকে দোকান বন্ধ রাখছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সহিংস রাজনীতি পরিহারের দাবি জানান তিনি।
নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এনসিসিআই) সভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুরো দেশের বস্ত্রশিল্পের চাহিদার ৭০ ভাগ পূরণ করে শেখেরচর-বাবুরহাট। সে জন্য আমরা বস্ত্রশিল্প মালিকেরা মার্কেটের চাহিদা অনুযায়ী কাপড় উৎপাদন করি। কিন্তু চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বেচাকেনায় মন্দাভাব চলছে। এতে আমাদের বস্ত্র উৎপাদনে যে ধস নেমেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।’

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন