রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) থাকা উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ভীষ্মদেব মণ্ডলকে কৃষি ব্যাংকে থাকাকালীন অপরাধের দায়ে শাস্তি দিল সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গত রোববার এক আদেশে তাঁর বেতনকাঠামো এক ধাপ নিচে নামিয়ে দিয়েছে। ভীষ্মদেবের বেতনকাঠামো ছিল ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা। কমিয়ে মন্ত্রণালয় তা নির্ধারণ করেছে ২৯ হাজার টাকা।
কৃষি ব্যাংক থেকে পাঁচ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে অ্যাকুয়া রিসোর্সেস নামের একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে। এ টাকা আদায়ের জন্য কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপ নিতে বলেছিল, ভীষ্মদেব সেগুলোর কিছুই পালন করেননি।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলম স্বাক্ষরিত এই আদেশ রোববারই অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, রূপালী ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক(এমডি)এবং ভীষ্মদেব মণ্ডলের কাছে পাঠানো হয়েছে।
আদেশে বলা হয়, রূপালী ব্যাংকের ডিএমডি হওয়ার আগে ভীষ্মদেব মণ্ডল ১০ মাস অর্থাৎ ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কৃষি ব্যাংকের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ছিলেন। তার আগেই অ্যাকুয়া রিসোর্সেস লিমিটেড নামের
একটি কোম্পানিকে খুলনা করপোরেট শাখা পাঁচ কোটি টাকা প্লেজ ঋণ দেয়। সাধারণত জমি বা স্থাবর কোনো সম্পত্তি জামানত রেখে যে ঋণ দেওয়া হয়, সেটিই প্লেজ ঋণ। ২০১১ সালে এ ঋণ দেওয়ার সময় করপোরেট শাখার উপমহাব্যবস্থাপক ছিলেন মোশাররফ হোসেন মিলন; বর্তমানে যিনি প্রধান কার্যালয়ে একই পদে রয়েছেন।
আদেশে বলা হয়, কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় জিএম হিসেবে ভীষ্মদেব মণ্ডলকে প্লেজ ঋণটির কার্যক্রম তদারক করা, মঞ্জুরিপত্রের শর্ত পরিপালনে কোম্পানিকে বাধ্য করা, রপ্তানি বিলের টাকা ৫ শতাংশ হারে সমন্বয় করে তার অগ্রগতির চিত্র ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পর্ষদকে জানানো ইত্যাদি দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু এগুলো পালন করেননি তিনি।
শুধু তা-ই নয়, উল্টো খুলনা করপোরেট শাখাকে মৌখিকভাবে ভীষ্মদেব মণ্ডল নির্দেশ দেন নগদ সহায়তার টাকা ৭০ শতাংশ অ্যাকুয়া রিসোর্সকে অগ্রিম হিসেবে দিয়ে দিতে। আদেশে বলা হয়, প্রধান কার্যালয়ের হস্তক্ষেপে অবশ্য এক বছর পর অর্থাৎ ২০১২ সালের মে মাস থেকে তিনি অ্যাকুয়া রিসোর্সকে অগ্রিম টাকা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। পরে আবার বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
ভীষ্মদেব মণ্ডলের এই কার্যকলাপকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫-এর ৩(বি) অনুযায়ী অসদাচরণ বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ তাই ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে তাঁর নামে বিভাগীয় মামলা করে এবং ১০ দিনের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে চান কি না এবং আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যক্তিগত শুনানি দিতে চান কি না—জানতে চায় তাঁর কাছে। কিন্তু তিনি জবাব ও শুনানি দিলেও মন্ত্রণালয়ের কাছে তা সন্তোষজনক মনে হয়নি।
আরও তদন্তের জন্য মন্ত্রণালয় এরপর আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের তৎকালীন এমডি এম এ ইউসুফকে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করে। এ বছরের জুলাইয়ে মন্ত্রণালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন জনাব ইউসুফ। এতে পাঁচটি অভিযোগ সম্পূর্ণ ও তিনটি আংশিক প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
এম এ ইউসুফ বর্তমানে কৃষি ব্যাংকের এমডি। জানতে চাইলে এ প্রতিবেদককে গতকাল তিনি বলেন, ভীষ্মদেবের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে। আর বাকিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কৃষি ব্যাংক।
অ্যাকুয়া রিসোর্সেস কাজী খায়রুজ্জামান শিপন নামের এক ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান দেখিয়ে ঋণ নিয়েছিল। কিন্তু ব্যাংক কাজী খায়রুজ্জামানকে চেয়ারম্যান মেনে নেননি। এ ছাড়া পাঁচ কোটি টাকা আত্মসাৎ নিয়ে পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরও কোনো ব্যবস্থা নেননি ভীষ্মদেব—আদেশে এসব কথাও উল্লেখ করা হয়।
যোগাযোগ করলে ভীষ্মদেব মণ্ডল গত রোববার প্রথম আলোকে বলেন, আদেশের কোনো কপি তিনি হাতে পাননি। তাই কোনো মন্তব্য করতে পারছেন না। নিজেকে নির্দোষ বলেও দাবি করেন তিনি।
জানতে চাইলে সচিব আসলাম আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘অসদাচরণের (কর্তব্য অবহেলা) কারণে বেতনকাঠামো নিচে নামিয়ে আনার ব্যাপারে তাঁকে দুই দফা কারণ দর্শাও নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের পক্ষে তিনি কোনো উপাদান বা প্রমাণক দাঁড় করাতে পারেননি।’
অ্যাকুয়া রিসোর্সেসের পরিচালক সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর মনজুর আহমেদ গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে মামলা চলছে। তাই তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না।

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন