পাটকলের ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিককে স্বেচ্ছা অবসরে পাঠানো হচ্ছে

বিজ্ঞাপন
default-image

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের লোকসানের বোঝা আর বইতে চাইছে না সরকার। তাই প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিককে স্বেচ্ছা অবসরে (গোল্ডেন হ্যান্ডশেক) পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি)। প্রক্রিয়াটি শেষ হলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) বা অন্য কোনোভাবে পাটকলগুলো চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাটকলের ব্যবস্থাপনাও বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে।

 জানা যায়, সরকারের উচ্চ মহলের সিদ্ধান্তের পরপরই বিজেএমসি ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিককে স্বেচ্ছা অবসরে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করে। তারই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের অংশ হিসেবে শ্রমিকেরা কী কী সুযোগ-সুবিধা পাবেন, তা শিগগিরই চূড়ান্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিজেএমসির আওতায় ২৬টি পাটকলের মধ্যে বর্তমানে চালু আছে ২৫টি। এর মধ্যে ২২টি পাটকল ও ৩টি নন–জুট কারখানা। পাটকলগুলোতে বর্তমানে স্থায়ী শ্রমিক আছেন ২৪ হাজার ৮৫৫ জন। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত বদলি ও দৈনিকভিত্তিক শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার।

দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছিল না। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পাটকলগুলো ৪৯৭ কোটি টাকার লোকসান গুনেছে। পরের বছর সেই লোকসান বেড়ে ৫৭৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। লোকসানের চক্কর থেকে বের হতে না পারায় পাটকলের শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া পড়ে। আন্দোলনে নামেন শ্রমিকেরা। তাঁদের অর্থ পরিশোধে অর্থ মন্ত্রণালয়ে হাত পাতে বিজেএমসি। কয়েক বছর ধরে এমন ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটে আসছে।

অন্যদিকে বিজেএমসির আয়ও বছর বছর কমছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে করপোরেশনটির আয় ছিল ১ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা। গত অর্থবছর সেটি কমে ৭০৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

>

পাটকলগুলো চলবে পিপিপিতে
ব্যবস্থাপনা ছেড়ে দেওয়া হতে পারে বেসরকারি খাতে

পাটকলগুলোর আয় কমে যাওয়া এবং বছরের পর বছর লোকসানের কারণ হিসেবে বিজেএমসির শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে শ্রমিকনেতারা বলছেন, লোকসানের বড় কারণ কাঁচা পাট কেনায় অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। তারা পাট কেনে দেরিতে ও বেশি দামে। এ ছাড়া সরকারি পাটকলের উৎপাদনশীলতা কম, উৎপাদন খরচ বেশি, যন্ত্রপাতি পুরোনো এবং বেসরকারি খাতের তুলনায় শ্রমিকের মজুরি বেশি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজেএমসির একজন কর্মকর্তা গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন মজুরি স্কেল কার্যকর হলেও সে অনুযায়ী মজুরি দেওয়া হয়নি। তাতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বকেয়া মজুরি রয়েছে। তা ছাড়া অবসরে যাওয়া প্রায় ৯ হাজার শ্রমিকের গ্র্যাচুইটি বাবদ ১ হাজার কোটি টাকা বকেয়া আছে। তিনি বলেন, গোল্ডেন হ্যান্ডশেকে শ্রমিকদের সর্বোচ্চ সুযোগ–সুবিধা দেওয়ার চিন্তাভাবনা হচ্ছে। যেমনটি আদমজী জুট মিল বন্ধের সময় দেওয়া হয়েছিল।

জানতে চাইলে বিজেএমসির চেয়ারম্যান মো. আবদুর রউফ গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, স্থায়ী শ্রমিকদের অবসরে পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। তবে এখনো সবকিছু চূড়ান্ত হয়নি। শ্রমিকদের বিষয়টি সুরাহা হওয়ার পরে পাটকলগুলো কীভাবে চলবে, তা ঠিক করা হবে। তিনি বলেন, গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের জন্য যে অর্থ প্রয়োজন, তা আগামী অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বিজেএমসির চেয়ারম্যান বলেন, গোল্ডেন হ্যান্ডশেক হলেও বর্তমানের শ্রমিকেরা পরে পাটকলগুলোতে কাজ করবেন। কারণ, তাঁদের মতো দক্ষ শ্রমিক আর পাওয়া যাবে না। গোল্ডেন হ্যান্ডশেকে শ্রমিকেরা কী পরিমাণ অর্থ পাবেন, সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, স্থায়ী শ্রমিকেরা গড়ে ১২ লাখ টাকা করে পাবেন। তবে সেটি চূড়ান্ত নয়।

এদিকে গতকাল বৈঠক শেষে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমানে পাটপণ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের হিস্যা মাত্র ৫ শতাংশ। পাটকলগুলো এত টাকা লোকসান দিয়েছে যে তা আর সরকারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। করোনার কারণে শ্রমিকদের ধাপে ধাপে টাকা দেওয়া হবে।

গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল থাকবে। তবে ব্যবস্থাপনা বেসরকারীকরণ করা হবে, যাতে লোকসান না হয়। পিপিপির ভিত্তিতে মিলগুলো চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরে শ্রমিকেরা টাকা পাবেন।

খুলনার প্লাটিনাম জুট মিলের সরদার খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা শ্রমিকেরা গোল্ডেন হ্যান্ডশেক চাই না। আমরা কাজ করে খেতে চাই।’ তিনি বলেন, প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে পাটকলগুলোর যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন করলেই উৎপাদন তিন গুণ বৃদ্ধি পাবে।

 জানতে চাইলে সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন প্রথম আলোকে বলেন, পাটকলগুলোকে আধুনিকায়ন করে লাভজনক করা সম্ভব। পাটকলগুলো পিপিপি মডেলে চালানোর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেওয়ার মতোই।

এদিকে বাম গণতান্ত্রিক জোট কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের সমন্বয়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ, সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাসদের সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকিসহ কয়েকটি বাম রাজনৈতিক দলের নেতা এক বিবৃতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্তে উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন