default-image

ভাও বুঝতে পারাটাই সফলতার প্রথম কথা। ভুসিমালের ব্যবসা থেকে রাজনীতি কিংবা উড়োজাহাজ নির্মাণ—সবকিছুতেই ভাও বুঝতে হয়। ভাও বুঝে পা ফেলতে হয়, বিনিয়োগ করা না–করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এটা একরকমের ঘ্রাণশক্তি। কেউ নাকের কাছে নিয়েও ঘ্রাণ পায় না, কেউ দূর থেকেও পেয়ে যায়। আমাদের আমদানিকারকেরা ভাও বোঝেন না, ঘ্রাণশক্তি কম, সেটা কেউই কবুল করবেন না। তারপরও তাঁরা বলে বেড়াচ্ছেন, ভারত যে পেঁয়াজ রপ্তানি আটকে দেবে, সেটা তাঁরা আগে থেকে কোনো ধারণা করতে পারেননি। নাকি আচ্ছামতো মজুত করে এখন নাকে কাঁদছে? চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের কথায় অন্তত সেই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, রাতারাতি পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীদের কারসাজি আছে। অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত শিগগিরই অভিযানে নামবেন।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ পেঁয়াজ ল্যাং খেয়েছিল। তার সব কটি কার্যকরণ এবার দৃশ্যমান। তারপরও কেউ যদি বলেন টের পাননি, তাহলে হয় তিনি বোকা অথবা অন্যদের তিনি বোকা বানাচ্ছেন। বিজনেস ইন্টেলিজেন্সের সব শাখার রিডিং ছিল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। গত বছর ভারতের মহারাষ্ট্রের নির্বাচন সামনে রেখে পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। এবার বিহার নির্বাচন। সেবারও কেন্দ্রের সরকার চায়নি পেঁয়াজের দামে দম আটকে যাক। তাই পেঁয়াজের দামের লাগাম টেনে ধরতে গতবার রপ্তানির দরজা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এবার বর্ষার পর দশেরার পালা চুকলেই বন্যাবিধ্বস্ত বিহারে নির্বাচন। সেখানে পেঁয়াজের দাম নিয়ে কোনো অসন্তোষ তৈরি হোক, সেটাও কেন্দ্রীয় সরকার চায় না। তাই কোনো ঝুঁকি নেয়নি। এতে কাছের প্রতিবেশী রাগ করবে না গোস্যা হবে, সেটা নিয়ে তাদের চর্চার সময় নেই। ভারতের রাজনীতিতে পেঁয়াজের যে কী কদর, তা সবার জানা। পেঁয়াজের বাড়তি দামের জের ধরে অতীতে সরকার পতনের মতো ঘটনাও ঘটেছে সে দেশে।

বিজ্ঞাপন

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, বাংলাদেশে এ বছর প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। গতবার পেঁয়াজচর্চার সময় কৃষিমন্ত্রী বেশ জোর দিয়েই বলেছিলেন আগে যেখানে প্রতি হেক্টরে ১০-১১ টন হতো, সেটা এবার হবে ১৮-১৯ টন। তবে তিনি কিছু ‘কিন্তু’, ‘যদি’ যোগ করে বলেছিলেন, ‘সবার কাছে নতুন বীজ পৌঁছালে’ সেটা সম্ভব। নতুন বীজ পৌঁছাক না পৌঁছাক এবার কৃষক অনেক জায়গায় অন্য ফসল বাদ দিয়ে পেঁয়াজ লাগিয়েছিলেন। বাড়তি জমি, ভালো বীজ সবকিছু মিলিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামলে এবার উৎপাদন বেড়েছিল। কিন্তু ন্যায্যমূল্য পায়নি। মার্চে পাবনার পেঁয়াজচাষি হারুনদের সরল হিসাবে (যার মধ্যে ব্যক্তিগত আর পারিবারিক খাটাখাটনির কোনো হিসাব ধরা হয় না) এক বিঘা পেঁয়াজ লাগাতে খরচ পড়েছিল ২০ হাজার টাকা। সে হিসাবে মাঠপর্যায়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ পড়ে অন্তত ৩০ টাকা। পাবনার কাশীনাথপুরের হাটে প্রতি কেজি দাম পেয়েছিল ৩৫–৩৭ টাকা। কৃষকের যদি কেজিপ্রতি ১০–১২ টাকা না থাকে তাহলে তিনি কেন আবার পেঁয়াজ করবেন। সে সময় কৃষিমন্ত্রীর মন্তব্য ছিল ‘এ রকম দাম থাকলেও কৃষকের লাভ থাকবে।’ এটা ছিল মার্চের প্রথম সপ্তাহের কথা। (আগস্টের আগে পেঁয়াজ আমদানি নয়, ১৩ মার্চ ২০২০, প্রথম আলো)। সে সময় কৃষকদের আবেদন ছিল পেঁয়াজ যেন আমদানি করা না হয়। কৃষিমন্ত্রী সে সময় দেশের খ্যাতিমান কৃষি বিশেষজ্ঞ, কৃষিবিদদের আহ্বান মেনে নিয়ে আমদানি আপাতত বন্ধ রাখার পক্ষে ছিলেন। কৃষিবিদেরা বলেছিলেন, ‘পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার বিষয় মাথায় রেখে আপাতত পেঁয়াজ আমদানির বিষয় মাথা থেকে বাদ দিতে হবে। আর আমদানি যদি করতেই হয়, তাহলে আগস্টের পরে।’

বিজ্ঞাপন

আগস্টের আগে পেঁয়াজ আমদানি না হলে কী হতো

বাংলাদেশের পেঁয়াজচাষিরা কেজিপ্রতি ১০–১২ টাকা করে পেতেন। তাঁরা পেঁয়াজ চাষে উৎসাহিত হতেন। পেঁয়াজকে অন্য আরও পাঁচটা ফসলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জমি পেতে হয়। বেশি পেঁয়াজ মানে কম আলু চাষ, কম ডাল চাষ, কোথাও কম ভুট্টা চাষ।

সবচেয়ে বেশি লাভ হতো ভারতের পেঁয়াজ কিনে খাওয়া আমজনতার। বাংলাদেশ ভারতের পেঁয়াজের প্রধান ক্রেতা হওয়ায় ও রপ্তানি কম হওয়ায় দাম নাগালের মধ্যেই থাকত। জুলাই–আগস্টের ঝড়বৃষ্টিতে কিছুটা দাম বাড়লেও আকাশ ছুঁত না। ভোট ব্যাংকের চিন্তায় দিল্লিকে রপ্তানি লক করতে হতো না।

বিজ্ঞাপন

আমরা কী করতে পারি

দেশে কমবেশি যে ২৩ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়, তার একটা বড় অংশ নানা কারণে নষ্ট হয়ে যায়। যাঁরা রেখেঢেকে কথা বলেন তাঁদের হিসাব অনুযায়ী নষ্টের পরিমাণ ৫ লাখ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক হামিদুর রহমান মনে করেন, নষ্টের পরিমাণ ৬ লাখ টনের কম নয়। কিছু নষ্ট হয় চাষির হাতে। তবে অনেকটায় নষ্ট হয় কারবারি আড়তদারদের হাতে। এটা আমরা রক্ষা করতে পারলে আমাদের আমদানির পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব।

আরেকটা পথ হচ্ছে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানো। যেহেতু পেঁয়াজকে অন্যান্য রবিশস্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জায়গা বের করে নিতে হয়, তাই মৌসুম বদলের কৌশলে যেতে হবে। মেহেরপুরের কৃষকেরা ইতিমধ্যেই সেই পথে হাঁটতে শুরু করেছেন। আউশ ধান কাটার পরপর তাঁরা ‘সুখসাগর’ নামের নতুন এক জাতের পেঁয়াজের আবাদ করছেন। এটাকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের যেখানে যেখানে আউশের আবাদ আছে, সেখানেই এটা চাষ করা সম্ভব। ডিসেম্বরের শুরুতেই এই পেঁয়াজ বাজারে চলে আসবে। তাহেরপুরি পেঁয়াজের (আমাদের চাষের মূল পেঁয়াজ) পাশাপাশি বারি উদ্ভাবিত গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ বারি পেঁয়াজ ৫ সম্প্রসারণে আরও কার্যকরী পদক্ষেপ নিলে আক্ষেপ কমবে। মার্চে লাগিয়ে জুনের প্রথম সপ্তাহে বর্ষার আগেই এই পেঁয়াজ ঘরে তোলা যায়। এসবের পাশাপাশি পেঁয়াজ গুদামজাত করা ও সংরক্ষণের সাশ্রয়ী প্রযুক্তির আশ্রয় আর গবেষণা বাড়াতে হবে।

সমাধান আমাদের হাতের মুঠোই আছে, দরকার শুধু সুচিন্তিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের। যে সিদ্ধান্ত তৈরি হবে কৃষকের কথা, কৃষিবিদ আর কৃষিবিজ্ঞানীদের কথার আলোকে।

লেখক: গবেষক, nayeem 5508 @gmail.com

মন্তব্য পড়ুন 0