২৮তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০১০ সালে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে যোগদান করলে তাঁর অধীনে কাজ করার সুযোগ হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মূল কাজ হলো অর্থনৈতিক কূটনীতির দায়িত্ব পালন। মধ্যপ্রাচ্য শাখা-১-এর দায়িত্ব বর্তায় আমার ওপর। উন্নয়ন সহযোগী দেশ সৌদি আরব ও ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ইসলামিক করপোরেশন ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অব দ্য প্রাইভেট সেক্টর (আইসিডি)’ ও ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি)’ সম্পর্কিত সব কার্যাদি মধ্যপ্রাচ্য শাখা-১-এর অন্তর্ভুক্ত। প্রায়ই এ-সংক্রান্ত নানা বিষয়ে মন্ত্রীর কাছে নথি পেশ করতে হতো। এর ধারাবাহিকতায় একবার আইসিডির নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার নিয়ে সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়। সংস্থার বোর্ড সভায় নীতিগত অনুমোদনপ্রাপ্ত তিনটি প্রস্তাবের মধ্য থেকে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মতামত চাওয়া হয়। তিনটি প্রস্তাবনা নিয়েই বিস্তারিত বর্ণনা করে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাবনা সমর্থন করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রী বরাবর সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয়। দুই দিন পর অনুমোদিত সারসংক্ষেপ শাখায় ফেরত আসে। তিনি শুধু প্রস্তাব অনুমোদন করেননি, চমৎকারভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করায় সারসংক্ষেপের শেষাংশে স্বহস্তে ধন্যবাদজ্ঞাপক মন্তব্য লিখে দেন। সরকারি চাকরির তিন মাসের মাথায় মন্ত্রীর কাছ থেকে এমন উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্য প্রাপ্তি ছিল সত্যিই অকল্পনীয়। এরপর আরও কয়েকবার তাঁর এমন লিখিত অভিবাদন পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে সাড়ে তিন বছর চাকরি শেষে নতুন কর্মস্থল অর্থ বিভাগে যোগদান করে আবুল মাল আবদুল মুহিতের আরও কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পাই।

বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী যে বক্তব্য উপস্থাপন করেন, তা অর্থ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যৌথভাবে প্রস্তুত করে। রাজস্ব আহরণ, আয়কর, মূল্য সংযোজন কর, আমদানি ও রপ্তানি শুল্কসংক্রান্ত বিষয়াদি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আর অন্যান্য বিষয়-সংক্রান্ত নীতি অর্থ বিভাগ প্রণয়ন করে। রাজস্ব বোর্ডসংক্রান্ত বক্তব্য একেবারে শেষ মুহূর্তে সন্নিবেশ করা হয় বলে বাজেট বক্তব্য বাজেট পেশের আগের রাতেই মুদ্রণ করা হয়। দেখা গেছে, মধ্যরাতে বাজেট বক্তব্যের খসড়া মুদ্রণের পর স্যার পুরোটা পড়ে তারপর চূড়ান্ত অনুমোদন দিতেন। এতে অনেক সময় গভীর রাত হয়ে গেলেও তাঁর মধ্যে ক্লান্তি বোধ দেখিনি। পরদিন সকালে ঠিকই মন্ত্রিসভায় উপস্থিত হয়ে প্রস্তাবিত বাজেটের নীতিগত অনুমোদন নিয়ে দুপুরে দীর্ঘ বাজেট বক্তব্য সংসদে পেশ করতেন। এত বয়সেও তাঁর এমন কর্মতৎপরতা সত্যিই ঈর্ষণীয়।

আমাদের অনুবিভাগের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা’ ও ‘বাংলাদেশ ইকোনমিক রিভিউ’ প্রণয়ন করা। প্রতিটি প্রকাশনাই প্রায় সাড়ে তিন শ পৃষ্ঠার। বাজেট উপলক্ষে অনেক ব্যস্ততার মাঝেও তিনি সাধারণত পুরো বই পড়ে মুদ্রণের অনুমোদন দিতেন। এমনও হয়েছে, ব্যস্ততার কারণে পুরো পাণ্ডুলিপি পড়তে না পাড়ায় বিদেশ যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে বসে পুরোটা পড়ে অনুমোদন দিয়েছেন। এ ছাড়া প্রতিটি নথিতেই তিনি কিছু না কিছু লিখতেন। কখনো সংশ্লিষ্টদের অভিবাদন জ্ঞাপন, কখনোবা কোনো উপদেশ, আবার কখনো তথ্য সংযোজন বা বিয়োজনের নির্দেশনাসংবলিত মন্তব্য লিখতেন।

default-image

‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা’ ও বাংলাদেশ ইকোনমিক রিভিউয়ে অর্থমন্ত্রীর মুখবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রতিবারই আমাকে মুখবন্ধটি লিখতে হয়েছে। খসড়াতে শব্দগত কিছু পরিবর্তন ছাড়া স্যার কখনো তেমন কিছু পরিবর্তন করেননি। ২০১৮ সালের রিভিউয়ে স্যারের সর্বশেষ মুখবন্ধ প্রকাশিত হয়। যথারীতি খসড়া উপস্থাপন করা হলে তিনি কয়েকটি শব্দ অদলবদল করে দেন। সংশোধিত খসড়ায় তাঁর স্বাক্ষর নিতে গেলে পুরোটা পড়ে হঠাৎ তাঁর স্বভাবসুলভ সরল হাসি দিয়ে বলেন, ‘সবকিছুই ঠিক লিখেছ, কেবল নামের বানান ভুল।’ ইংরেজিতে তিনি ‘Muhit’ নয়, লিখতেন ‘Muhith’। এ ঘটনায় যত না লজ্জিত হয়েছি, তার চেয়ে বেশি বিমোহিত হয়েছি স্যারের আচরণে—এমন ভুলের কারণে রাগান্বিত হয়ে রূঢ় আচরণ করাই ছিল স্বাভাবিক, অথচ স্যার এত সহজভাবে ভুলটা ধরিয়ে দিলেন যেন তা হতেই পারে।

কাজ করতে গিয়ে স্যারের প্রখর স্মৃতিশক্তির প্রমাণ পেয়েছি বহুবার। কয়েক দশক আগের ঘটনাবলি দিন, তারিখ সময়সহ তিনি এত স্পষ্টভাবে বলতে পারতেন যে মনে হতো, যেন কয়েক দিন আগের ঘটনা।

স্যারের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল ২০২০ সালে তাঁর জন্মদিনে। জন্মদিন উপলক্ষে তাঁকে নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে লিখেছিলাম। লেখাটি পড়ে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। এরপর মাঠ প্রশাসনে চলে আসায় তাঁর সঙ্গে আর দেখা হয়নি।

শুরুতে বলেছি, তাঁর প্রথম বক্তব্য শুনেই মনে হয়েছিল, নতুন কিছু করার প্রত্যয় নিয়েই তিনি রাজনীতিতে এসেছেন। স্বেচ্ছায় নির্বাচন ও মন্ত্রিত্ব থেকে সরে গিয়ে প্রমাণ করেছিলেন, তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা। মন্ত্রী হিসেবে শেষ কার্যদিবসে অর্থ বিভাগের দেওয়া সংবর্ধনায় তিনি বলেন, লেখালেখি আর ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা অর্ধলক্ষাধিক বই পড়ার মাধ্যমেই কাটাতে চান অবসরজীবন। কিন্তু নানাবিধ রোগব্যাধি তাঁর অবসরজীবনকে উপভোগ্য হতে দেয়নি। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, কুড়িগ্রাম

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন