default-image

সাড়ে পাঁচ বছর আগে প্রাথমিক পরিদর্শনে দেড় হাজার পোশাক কারখানায় নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি পাওয়া যায়। কিন্তু সেসব ক্রটির সংস্কারকাজ করতে গড়িমসি করেন কারখানার মালিকেরা। তখন সংস্কারকাজে গতি আনতে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি প্রাপ্যতা (ইউডি) ও কারখানার বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাতেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। এ কারণে দুই বছর ধরে এসব কারখানার সংস্কারকাজের অগ্রগতি ৩৮ থেকে ৪৫ শতাংশের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। যদিও বন্ধ, স্থানান্তরসহ নানা কারণে ত্রুটিপূর্ণ কারখানার সংখ্যা অর্ধেকের বেশি কমে সাড়ে ছয় শতে নেমেছে।

জাতীয় ত্রিপক্ষীয় কর্মপরিকল্পনার (এনটিএপি) অধীনে থাকা এই কারখানাগুলোর সংস্কারকাজ কচ্ছপগতিতে চলার কারণে রানা প্লাজা ধসের আট বছর পরও রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি। আদৌও করা যাবে কি না তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। কারণ, মহামারি করোনার অজুহাতে অধিকাংশ কারখানা মালিকই এখন সংস্কারকাজে নতুন করে অর্থ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নন। তা ছাড়া সরকার কিংবা বিদেশি ক্রেতাদেরও এ নিয়ে তেমন চাপ নেই।

ক্রেতাদের দুই জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স এ দেশ থেকে কার্যক্রম গোটানোর কারণে মাঝারি ও বড় প্রায় দুই হাজার কারখানার সংস্কারকাজেও ধাক্কা লেগেছে। কারখানাগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি ত্রুটি সংশোধন করা হলেও বাদবাকি কাজ কবে শেষ হবে, তা কেউ বলতে পারছে না। যদিও অ্যাকর্ডের কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে আরএমজি সাসটেইনিবিলিটি কাউন্সিল (আরএসসি) গঠিত হয়েছে। আর অ্যালায়েন্সের তত্ত্বাবধানে থাকা কারখানাগুলো দেখভাল করতে নিরাপন নামের একটি সংস্থা গঠিত হলেও সেটি এখন নেই।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের পোশাক কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা দুর্বল, সেটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল সাভারের রানা প্লাজার ধস। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঘটে যাওয়া দেশের সবচেয়ে বড় এই শিল্প দুর্ঘটনার আট বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ শনিবার। তবে সংস্কারকাজ না করায় পোশাকশিল্পের নিরাপত্তার গলার কাঁটা হয়ে আছে সাড়ে ছয় শ কারখানা। তার বাইরে আট বছরেও ৬৫৪ কারখানাকে পরিদর্শন কার্যক্রমের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। কারণ, তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য না হওয়ায় কারখানাগুলোর দায়িত্ব কেউ নেয়নি। ধসে যাওয়া রানা প্লাজায় পাঁচটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোশাক কারখানা ছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তৈরি পোশাকশিল্পের একজন মালিক বলেন, ‘ব্যবসা হারানোর চাপে পড়ে মাঝারি ও বড় কারখানার মালিকেরা কোটি কোটি টাকা খরচ করে সংস্কারকাজ করেছে। ছোটরা সেই কাজ করেনি। এতে করে যেটি হয়েছে, আমরা কেউ ঝুঁকিমুক্ত হতে পারিনি। নতুন করে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে পুরো পোশাকশিল্প আবারও ভয়াবহ বিপদে পড়বে। সংস্কারকাজের যেটুকু অর্জন সেটুকু বিফলে যাবে।’

রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে পাঁচ বছরের জন্য ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স গঠিত হয়। তারা দুই হাজারের বেশি পোশাক কারখানা পরিদর্শন করে বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি চিহ্নিত করে। আর অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের বাইরে থাকা কারখানাকে সংস্কারকাজের আওতায় আনতে এনটিএপির অধীনে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) পরিদর্শন কাজ করে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নেতৃত্বে ও ডিআইএফইর তত্ত্বাবধানে গঠিত সংশোধন সমন্বয় সেল (আরসিসি) কারখানাগুলোর দেখভাল করছে।

default-image

কাজ কেন এগোচ্ছে না

এনটিএপির অধীনে ১ হাজার ৫৪৯ পোশাক কারখানার পরিদর্শন ২০১৫ সালের নভেম্বরে শেষ হয়। ওই সময় ডিআইএফই বলেছিল, কারখানাগুলোর কোনোটিই শতভাগ ত্রুটিমুক্ত নয়। কিন্তু বারবার চাপ দিয়েও এসব কারখানার সংস্কারকাজে গতি আনতে ব্যর্থ হয় অধিদপ্তর। পরে সংস্কারকাজ তদারকিতে আরসিসি গঠিত হয়, কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি। এ অবস্থায় আগামী ৩০ জুন শেষ হতে যাচ্ছে আরসিসির মেয়াদ।

ডিআইএফইর কর্মকর্তারা জানান, কারখানা মালিকেরা নানা অজুহাত দেখিয়ে কারখানার সংস্কারকাজে আগ্রহী না। এসব কারখানা যেসব ক্রেতার কাজ করে তাদের কারখানার নিরাপত্তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। ফলে কারখানার সংস্কারকাজ করা না করায় ব্যবসা হারানো ভয় নেই।

জানা যায়, বর্তমানে আরএসসির অধীনে ৬৫২টি কারখানা রয়েছে। এখন পর্যন্ত কারখানাগুলোর ত্রুটি সংস্কারের অগ্রগতি ৪৫ শতাংশ। কোনো কাজ না করায় শতাধিক কারখানা বন্ধ করে দিতে চলতি বছরের গোড়ার দিকে অধিদপ্তরকে চিঠি দেয় আরসিসি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এখনো। অবশ্য এসব কারখানার ইউডি সেবা বন্ধ করে দিতে ২০১৮ সালে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে চিঠি দিয়েছিল ডিআইএফই। তখন ব্যবস্থা না নিয়ে আরও সময় চেয়েছিলেন সংগঠন দুটির নেতারা।

জানতে চাইলে আরসিসির প্রকল্প পরিচালক এ কে এম সালেহ উদ্দিন গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, কারখানা মালিকেরা গত এক বছরে কিছু সংস্কারকাজ করেছে, তবে সেটি না করার মতোই। কিছু কারখানায় অবশ্যই নিরাপত্তাঝুঁকি রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরএসসি কাজ করছে, তবে

নানা টানাপোড়েন শেষে গত বছরের ৩১ মে আরএমজি সাসটেইনিবিলিটি কাউন্সিলের (আরএসসি) কাছে কার্যক্রম হস্তান্তর করে বাংলাদেশ ছাড়ে অ্যাকর্ড। জাতীয় উদ্যোগে গঠিত হলেও আরএসসির মূল হর্তাকর্তা বিজিএমইএর নেতারা। গত সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করা সংস্থাটি ইতিমধ্যে বিলুপ্ত অ্যাকর্ডের দুই শতাধিক প্রকৌশলী নিয়োগ দিয়েছে।

জানতে চাইলে বিজিএমইএর সহসভাপতি মিরান আলী প্রথম আলোকে বলেন, আরএসসি দায়িত্ব নেওয়ার পর চলমান লকডাউনের আগপর্যন্ত ফলোআপ পরিদর্শন ছিল সন্তোষজনক। অ্যাকর্ড যে গতিতে পরিদর্শন করেছিল তার চেয়ে দ্রুতগতিতে আরএসসি কাজ করছে বলে দাবি করেন তিনি।

অ্যাকর্ডের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের ক্রেতাদের এই জোটের পরিদর্শন ও সংস্কার কার্যক্রমের অধীনে ছিল ১ হাজার ৬২৯ কারখানা। গত বছর অ্যাকর্ড যখন বাংলাদেশ ছাড়ে তখন কারখানাগুলোর অগ্নি, বৈদ্যুতিক ও কাঠামোগত ত্রুটির ৯২ট শতাংশ সংশোধনকাজ শেষ হয়। আর ২৭৯টি কারখানা প্রাথমিক পরিদর্শনে পাওয়া সব ত্রুটি সংশোধন করেছিল। আরএসসি দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত কারখানাগুলোর ত্রুটি সংশোধন ১ শতাংশ বেড়েছে। আর সব ত্রুটি সংশোধন সম্পন্ন করা কারখানার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫৯। তবে ১ হাজার ২৪৩টি কারখানায় মানসম্মত অগ্নিশনাক্তকরণ ও ফায়ার অ্যালার্ম যন্ত্র বসানো হয়নি। ৩৭৫টি কারখানার কাঠামোগত সংস্কারকাজ বাকি রয়েছে।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পোশাকশিল্পে অগ্নিদুর্ঘটনা ও বিস্ফোরণের ঘটনা বাড়তে শুরু করেছে। এসব ঘটনায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্স থাকার সময়ে কর্মপরিবেশের নিরাপত্তার যে অগ্রগতি হয়েছিল, তাতে শিথিলতা চলে এসেছে। তিনি বলেন, অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের মতো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরএসসির বেলায় দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে আরসিসির কার্যক্রম হতাশাজনক। তাদের কাঠামোতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় সংস্কারকাজে অগ্রগতি নেই।

সিপিডির এই গবেষক বলেন, পোশাক কারখানার নিরাপত্তায় যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা রয়েছে। ডিআইএফই ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেফটি ইউনিট করার কথা বলেছিল। সেটির অধীনে আরসিসি ও আরএসসিকে নিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন