default-image

তৈরি পোশাকের বড় বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১১ মাস ধরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে নিম্নমুখী ধারা থেকে বের হতে পারছে না বাংলাদেশ। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে কানাডায় পোশাক রপ্তানি কমেছে সাড়ে ১৩ শতাংশ। জার্মানিতেও প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক। তুরস্ক, চিলি ও মেক্সিকোর বাজারেও একই অবস্থা।
যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও কানাডা এই তিন বাজারে গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৫২ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। এই আয় সে সময়ের ২ হাজার ৪৪৯ কোটি ডলারের পোশাকের রপ্তানির ৪২ শতাংশ। এ ছাড়া রপ্তানির পরিমাণের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এমন তথ্যই দিয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্যানুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে অর্থাৎ জুলাই-জানুয়ারিতে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় ১ হাজার ৪৪৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ২৯৩, জার্মানি ২৫৪ ও কানাডায় ৫১ কোটি ডলার। এ ক্ষেত্রে গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে পোশাক রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রে ৩ দশমিক ৫৯, জার্মানিতে শূন্য দশমিক ৩৮ ও কানাডায় ১৩ দশমিক ৫২ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে তুরস্কে ২৯ দশমিক ৩০ শতাংশ কমে রপ্তানি ২৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে আলোচ্য সময়ে পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৯২ শতাংশ।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকেরা বলছেন, বর্তমান রপ্তানির নিম্ন প্রবৃদ্ধি সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা যোগ হওয়ায় ঘোলাটে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এখন কাজ পাওয়ার ভরা মৌসুম হলেও বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশে আসছেন না। ফলে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ক্রয়াদেশ ৩০-৫০ শতাংশ কমে গেছে। ক্রয়াদেশ বাতিলের ঘটনাও ঘটছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে গত অর্থবছরে পোশাক রপ্তানিতে যে ১৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, এবার সেটিও ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
জানতে চাইলে বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শহিদউল্লাহ আজিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের পর অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশে কাজ দেওয়া কমিয়ে দেয়। ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের কারখানা পরিদর্শনের পুরো সময়টা তারা পর্যবেক্ষণ করে। তবে পরিদর্শনের ফলাফল ইতিবাচক হওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে আবার আস্থা ফিরে আসে। গত ডিসেম্বরে আয়োজিত অ্যাপারেল সামিটে ক্রেতারা বার্তা দিয়েছিল, তারা আমাদের আবার কাজ দেবে।’
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে বিজিএমইএর সহসভাপতি বলেন, ‘যে অবস্থা চলছে তাতে রপ্তানি নয়, আমাদের টিকে থাকাই মুশকিল।’ তিনি বলেন, ‘ক্রয়াদেশ পেলে ব্যাংকে ঋণপত্র খুলে প্যাকিং ক্রেডিট নিয়ে মালিকেরা শ্রমিকদের বেতন দেন। তবে এখন কাজই কম দিচ্ছেন ক্রেতারা। এমনটা চললে দু-তিন মাস পর অনেক কারখানার কাছেই কোনো কাজ থাকবে না।’
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে শহিদউল্লাহ আজিম বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের পর ওয়ার্ল্ড ডিজনি বাংলাদেশ থেকে ৫০ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ ফিরিয়ে নেয়। এখন পর্যন্ত ব্র্যান্ডটির কাছ থেকে পুরোটা আমরা ফিরিয়ে আনতে পারিনি। আসলে একবার ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিলে তাদের ফেরানো খুব কঠিন।’
প্রতিযোগী ভারত ও ভিয়েতনাম এগিয়ে: যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ থেকে গত বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বরে ৪৮৩ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। এই আয় ২০১৩ সালের ৪৯৪ কোটি ডলারের চেয়ে ২ দশমিক ২৯ শতাংশ কম। গত বছরের দ্বিতীয় মাস থেকেই এই বাজারে রপ্তানিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি কমলেও বিভিন্ন দেশ থেকে পোশাক আমদানি ঠিকই বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ২ হাজার ৫৬৪ বর্গমিটারের সমপরিমাণ মোট ৮ হাজার ১৭৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যা ২০১৩ সালের চেয়ে ৭ হাজার ৯৭৯ কোটি ডলারের চেয়ে আড়াই শতাংশ বেশি। ফলে প্রবৃদ্ধির বিচারে বাজারটিতে বাংলাদেশের ভিয়েতনাম, ভারত ও মেক্সিকো এগিয়ে গেছে।
অবশ্য রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমলেও যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকের বাজার হিস্যায় ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। উভয় দেশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ দখল করে আছে। আর প্রথম দুই অবস্থানে আছে যথাক্রমে চীন ৩৬ দশমিক ৪৩ ও ভিয়েতনাম ১১ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্স অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলে (অটেক্সা) ৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত পরিসংখ্যানে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। এতে উল্লেখ করা হয়, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ ১৬০ কোটি ৯৭ লাখ বর্গমিটার সমপরিমাণ তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। তার আগের বছর এই পরিমাণ ছিল ১৬৯ কোটি বর্গমিটার। সেই হিসাবেও প্রবৃদ্ধি কমেছে ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
অন্যদিকে ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া ৮ হাজার ১৭৮ কোটি ডলারের মধ্যে চীনের ২ হাজার ৯৭৯ কোটি ডলার। তার পরের অবস্থানে আছে ভিয়েতনাম, ৯২৬ কোটি ডলার। যৌথভাবে তৃতীয় ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশ। আর চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে আছে মেক্সিকো ও ভারত। দেশ দুটির রপ্তানি যথাক্রমে ৩৭৩ ও ৩৪০ কোটি ডলার।
পরিমাণে এখনো কম হলেও ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এগিয়ে যাচ্ছে। আলোচ্য সময়ে ভারতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ। ২০১৩ সালে ছিল ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। অন্যদিকে পরিমাণের দিক থেকে শীর্ষ দশে থাকা রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি ভিয়েতনামের, ১৪ শতাংশ।
এদিকে শুরু যুক্তরাষ্ট্র নয়, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে বিভিন্ন দেশে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের চেয়ে ভারত ও ভিয়েতনাম এগিয়ে গেছে। আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি যেখানে মাত্র ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ, সেখানে ভারত ও ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ৯ দশমিক ৯৬ এবং ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। গত বুধবার বিজিএমইএ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সংগঠনের সভাপতি আতিকুল ইসলাম এমন তথ্যই জানান।
যোগাযোগ করা হলে আতিকুল ইসলাম বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাদের উৎপাদন ব্যয় কম। একই সঙ্গে তাদের দেশে ব্যবসা করার অনুকূল পরিবেশ আছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। ফলে আমরা ব্যবসা ও পরিবেশগত প্রতিযোগিতার দিক থেকে হেরে যাচ্ছি। ক্রেতারা ভারত ও ভিয়েতনামের দিকে ছুটছেন। তাদের রপ্তানি বাড়ছে। আমাদেরটা কমছে।’
পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ কী জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘আমরা কিন্তু আবার ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করেছিলাম। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমাদের বড় ধাক্কা খেতে হলো। শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ কী, তা সবাই অনুমান করতে পারবেন। ধ্বংস।’
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ড, রানা প্লাজা ধস ও ২০১৩ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পরও পোশাক রপ্তানিতে এখনো ২ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি আছে। এই পরিসংখ্যানটি যদি সত্য হয়, অবশ্যই তা বিস্ময়কর ঘটনা। আর এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশে সুশাসন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলে অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী হতো। কারণ, অপেক্ষাকৃত কম মানের পণ্য সবচেয়ে কম দামে বিশ্বের আর কোনো দেশ দিতে পারে না।
এম এম আকাশ আরও বলেন, ‘বর্তমানে একধরনের “জরুরি” অবস্থা চলছে। ক্রেতারা দেশে আসছে না। তাই টিকে থাকতে হলে পোশাকমালিকদের আগ্রাসী বিপণনে নামতে হবে। একই সঙ্গে বাজার বহুমুখীকরণেও যেতে হবে তাদের।

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন