বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
যত দ্রুত সম্ভব গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া উচিত। তাতে কোনটি আবাসিক আর কোনটি বাণিজ্যিক এলাকা হবে, তা ঠিক করে দিতে হবে।
আনোয়ার সাদাত সভাপতি গাজীপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন না করার নির্দেশ আছে পরিবেশ অধিদপ্তরের। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নির্দেশ অমান্য করে অপরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে গড়ে উঠেছে শিল্পকারখানা।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর জেলায় এখন ছোট–বড় মিলে মোট পাঁচ হাজার কারখানা রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ কারখানা স্থাপন করা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। এ ছাড়া ভাওয়াল বন দখল করে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক রিসোর্ট।

সম্প্রতি গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শুধু বিএসএমআরএইউতেই নয়, গাজীপুরে যত্রতত্র যে যার মতো করে শিল্প স্থাপনা গড়ে তুলছে। এ ধরনের অপরিকল্পিত শিল্পায়নের কারণে নদী-খাল সবই দখল হচ্ছে, দূষিতও হচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে কিছুই নেই। ড্রেনেজ বা পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাও দুর্বল। এখানে যেন কারও নিয়ন্ত্রণ নেই। গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন হলেও এখনো কার্যকর হয়নি।

আলাপকালে কয়েকজন পুরোনো এলাকাবাসী জানান, গাজীপুরের মানুষের কাছে একসময় মাছের বড় উৎস ছিল চিলাই নদ ও বেলাই বিল। কিন্তু চিলাই নদ দখল হতে হতে এখন খালে পরিণত হয়েছে। শিল্পবর্জ্যের কারণে এই নদ আর বেলাই বিলে আগের মতো মাছ মিলছে না।

জয়দেবপুর কাঁচাবাজারে কথা হয় ধীরেন্দ্র মাছের আড়তের স্বত্বাধিকারী নারায়ণ চন্দ্র দাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, একসময় গাজীপুরের নদী-বিল-জলাশয় থেকে পাওয়া মাছ দিয়ে এই জেলার চাহিদা মিটত। কিন্তু কারখানার বর্জ্যের কারণে এখন আর নদী-বিল-জলাশয়ে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। তাই টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, শেরপুর, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে মাছ আনা হয়।

জয়দেবপুর বাজারের মাছ ও সবজি বিক্রেতা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, নদী দখল করে শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। কারখানার পচা পানি নদ ও বিলে গিয়ে পড়ছে। ফলে আগের মতো এখন আর মাছ পাওয়া যায় না। সবজিও হয় না আগের মতো। সবজি আনা হয় উত্তরাঞ্চল থেকে।

একসময় পোলট্রি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ হতো গাজীপুর থেকে। গাজীপুরে উৎপাদিত ডিম দিয়ে ঢাকার চাহিদা মেটানো হতো। কিন্তু অপরিকল্পিত শিল্পায়নের কারণে গাজীপুরে পোলট্রি ব্যবসাও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। পোলট্রি দোকানের জায়গায় গড়ে উঠেছে শিল্পকারখানা। যেমন গাজীপুর সদরের মেম্বার বাড়ি এলাকার রবিন পোলট্রি কমপ্লেক্সের জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে পোশাক কারখানা। একইভাবে বন্ধ হয়েছে বাঘের বাজার এলাকার এপিসি পোলট্রি। স্থানীয় পোলট্রি ব্যবসায়ী তোফাজ্জল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এই ব্যবসায়ে এখন মন্দা চলছে।

গাজীপুরের বোর্ডবাজার, আমবাগসহ কয়েকটি আবাসিক এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, যেখানে–সেখানে অপরিকল্পিতভাবে ঝুটের গোডাউন
গড়ে উঠেছে।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় স্থায়ী বাসিন্দা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। শিল্পকারখানা স্থাপন বৃদ্ধি পাওয়ায় আবাসনের চাহিদা ও বাড়ি ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ফলে গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিত স্থাপনা। সড়কের জন্য তেমন জায়গা না রেখেই ইচ্ছেমতো এখানে–ওখানে তৈরি করা হচ্ছে ঘরবাড়ি। ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে খাল-বিলে।

জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গিয়াসউদ্দীন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, অবৈধভাবে ভাওয়াল বন কেটে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে গাজীপুর। এই জেলায় পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠানও আছে। এ ধরনের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যেখানে–সেখানে শিল্পায়ন যায় না।

গাজীপুর শিল্প পুলিশ সুপার সিদ্দিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘গাজীপুরের জন্য কোনো মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনা নেই। দুটি কারখানার মাঝখান দিয়ে যাতায়াতে কোনো রাস্তা রাখা হচ্ছে না। ফলে অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দুর্ঘটনাস্থলে যেতে পারে না। যে কারণে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়। গাজীপুরের জন্য জরুরি ভিত্তিতে মাস্টারপ্ল্যান করা জরুরি।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, গাজীপুরে নির্বিচার বন উজাড় করে গড়ে তোলা হচ্ছে শিল্পকারখানা। বন বিভাগের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে গাজীপুরে মোট ৪ দশমিক ৮১ শতাংশ বন কমেছে। পরের চার বছরে বন কমে যাওয়ার হার অন্তত ৫-৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে বলে বন বিভাগের ধারণা।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন