বাংলাদেশ পঞ্চমবারের মতো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসির সমন্বয়ক মনোনীত হয়েছে।
এর মাধ্যমে ডব্লিউটিওতে বর্তমানে ৩৪টি স্বল্পোন্নত দেশের যে দল (এলডিসি গ্রুপ) রয়েছে, তাদের স্বার্থে আবার কাজ করার সুযোগ তৈরি হলো বাংলাদেশের জন্য। বিশ্ব বাণিজ্যে নিজেদের হিস্যা আদায়ের কৌশল নির্ধারণে ১৯৯৫ সালে ডব্লিউটিওর যাত্রা শুরুর পরপরই গঠিত হয় এ দল।
সম্প্রতি এলডিসি গ্রুপের এক সভায় বাংলাদেশকে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সমন্বয়ক হিসেবে উগান্ডার স্থলাভিষিক্ত হলো বাংলাদেশ। ১৯ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার থেকে পরবর্তী ছয় মাস বাংলাদেশ এ দায়িত্ব পালন করবে। তবে মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়তে পারে।
জাতিসংঘের হিসাবে বর্তমানে বিশ্বে ৪৮টি দেশ হলো স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি। এর মধ্যে ৩৪টি দেশ ডব্লিউটিওর সদস্য। বাংলাদেশ সমন্বয়ক হয়েছে তাদেরই।
এদিকে বাংলাদেশ আবারও এলডিসির সমন্বয়ক হওয়ায় স্বাগত জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এর আগে বাংলাদেশ ১৯৯৬, ২০০৩, ২০০৬ এবং ২০১০ সালেও এলডিসির সমন্বয়ক ছিল। সমন্বয়ক ছাড়াও এলডিসিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সব সময়ই নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করে আসছে।
যোগাযোগ করলে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোতে এলডিসির শুল্ক ও কোটামুক্ত পণ্য রপ্তানির দাবিতে বাংলাদেশ সব সময়ই উচ্চকণ্ঠ। আবারও সময়ন্বক হওয়ায় এ দায়িত্ব আরও বাড়ল।’
তোফায়েল আহমেদ বলেন, শুধু শুল্ক ও কোটামুক্ত পণ্য রপ্তানি নয়, সেবা খাতে বাজার পেতেও নিজেদের অধিকার, সুযোগ ও স্বার্থের বিষয়ে জোরালো ভূমিকা রাখবে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান ও সক্ষমতার কারণে এলডিসির অনেক সদস্যই আমাদের ঈর্ষার চোখে দেখে। যতই দেখুক না কেন, এলডিসির জন্য আমরা আমাদের কাজ করে যাব।’
জানা গেছে, এলডিসির উন্নয়নে ডব্লিউটিওতে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক (গ্রিনরুম মিটিং) অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, যেগুলোতে শুধু সমন্বয়ক দেশের প্রতিনিধিই উপস্থিত থাকতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সমন্বিত অধিকার আদায়ের ব্যাপারে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষি চললেও এশিয়ার এলডিসি ও আফ্রিকার এলডিসিগুলোর মধ্যে সব সময়ই একটা প্রতিযোগিতা বা মতবিরোধ থাকে। মহাদেশভেদে স্বার্থের বিষয়গুলো ভিন্ন বলেই এ প্রতিযোগিতা।
এশিয়ার এলডিসির প্রধান স্বার্থের জায়গা হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারসহ তৈরি পোশাকের রপ্তানি বৃদ্ধি। এ ছাড়া রয়েছে সেবা খাতের বাজার। আর আফ্রিকার এলডিসির প্রধান স্বার্থ হলো কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য রপ্তানিতে নিরঙ্কুশ ও শর্তমুক্ত প্রবেশাধিকার।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ যে এলডিসির সমন্বয়ক হলো, তা এক দিক থেকে স্বীকৃতি, অন্য দিক থেকে সুযোগ।’ কারণ, সমন্বয়ক হওয়ার জন্য অনেক এলডিসির সক্ষমতাই নেই বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্বব্যাংকের এক হিসাব অনুযায়ী, ৪৮টি এলডিসির মধ্যে বিশ্বের ৮৫ কোটি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে অর্ধেকেরই অবস্থান দারিদ্র্যসীমার নিচে। বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশ, পণ্য বাণিজ্যের ১ শতাংশ এবং সেবা বাণিজ্যের মাত্র দশমিক ৫ শতাংশের ভাগীদার এলডিসিভুক্ত দেশগুলো। ডব্লিউটিওর অধীনে বাণিজ্য স্বার্থসম্পর্কিত বাংলাদেশসহ যে ৩৪টি এলডিসি রয়েছে, এদের অবস্থা আরও খারাপ।
এ অবস্থার উন্নয়নে করণীয় কী—জানতে চাইলে বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ‘নিজের স্বার্থ তো বটেই, বাকি এলডিসির স্বার্থের দিকও বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশকে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাহলেই যেকোনো স্বার্থসম্পর্কিত বিষয়ে এলডিসির অন্য সদস্যদের বাংলাদেশের পাশে পাওয়া যাবে।’

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন