নতুন নিলামের মাধ্যমে বাড়তি টুজি ও থ্রিজি তরঙ্গ (স্পেকট্রাম) মুঠোফোন অপারেটরদের কাছে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। নিলাম অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত অনুমোদন ও খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত করার জন্য ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে বিটিআরসি।
খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, ১ হাজার ৮০০ মেগাহার্টজের জন্য নিলামের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে তিন কোটি মার্কিন ডলার বা ২৩৪ কোটি টাকা (১ ডলার ৭৮ টাকা হিসেবে)। ২ হাজার ১০০ মেগাহার্টজের ভিত্তিমূল্য ২ কোটি ২০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৭০ কোটি ধরা হয়েছে। টুজির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে অপারেটররা ১ হাজার ৮০০ মেগাহার্টজ ও তৃতীয় প্রজন্মের থ্রিজি নেটওয়ার্কের জন্য ২ হাজার ১০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ব্যবহার করে।
বিটিআরসির কাছে বর্তমানে ১ হাজার ৮০০ মেগাহার্টজের বাড়তি ১০ দশমিক ৬ মেগাহার্টজ তরঙ্গ আছে। এই তরঙ্গকে ৫ মেগাহার্টজ ও ৫ দশমিক ৬ মেগাহার্টজে ভাগ করে নিলামে বিক্রি করা হবে। অপারেটরদের মধ্যে যাদের আগের তরঙ্গ ফি বাবদ রাজস্ব বকেয়া আছে এবং যারা আগেই ২০ মেগাহার্টজের বেশি তরঙ্গ বরাদ্দ নিয়েছে তারা প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৮০০ মেগাহার্টজের নিলামে অংশ নিতে পারবে না। ৯০০ ও ১ হাজার ৮০০ মেগাহার্টজ মিলে অপারেটরদের মধ্যে শুধু গ্রামীণফোনের ২০ মেগাহার্টজের বেশি তরঙ্গ আছে। সে হিসেবে গ্রামীণফোন টুজির প্রাথমিক নিলামে অংশ নিতে পারবে না।
বিটিআরসির প্রস্তাবিত এ সিদ্ধান্তকে বৈষম্যমূলক বলে মনে করছে গ্রামীণফোন। গ্রামীণফোনের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক মুনির হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘১ হাজার ৮০০ মেগাহার্টজের তরঙ্গ বিক্রির খসড়ার যোগ্যতার ধারা অনুযায়ী গ্রামীণফোনকে নিলামে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া হলে কৃত্রিমভাবে প্রতিযোগিতায় বাধা তৈরি করা হবে।’
টুজির ৯০০ ও ১ হাজার ৮০০ মেগাহার্টজ এবং থ্রিজির ২ হাজার ১০০ মেগাহার্টজ মিলিয়ে গ্রামীণফোনের মোট তরঙ্গের পরিমাণ ৩২ মেগাহার্টজ, বাংলালিংকের ২০ মেগাহার্টজ, রবির ১৯ দশমিক ৮০ মেগাহার্টজ, এয়ারটেলের ২০ মেগাহার্টজ ও টেলিটকের কাছে আছে ২৫ দশমিক ২০ মেগাহার্টজ। বর্তমান তরঙ্গে প্রতি মেগাহার্টজে গ্রামীণফোন ১৬ লাখ গ্রাহককে সেবা দেয়। বাংলালিংক প্রতি মেগাহার্টজে ১৫ লাখ, রবি ১৩ লাখ, এয়ারটেল ৩ লাখ ৭০ হাজার ও টেলিটক ১ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহককে সেবা দেয়।
প্রতি মেগাহার্টজে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক গ্রাহককে সেবা দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে মুনির হাসান বলেন, ‘গ্রামীণফোন অন্যদের চেয়ে দক্ষতার সঙ্গে তরঙ্গ ব্যবহার করে প্রতি মেগাহার্টজে ১৬ লাখ গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে। গ্রামীণফোনকে টুজি নিলামে অংশ নিতে না দেওয়া হলে তা নিশ্চিতভাবে আমাদের গ্রাহক প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করবে।’
আরেক অপারেটর রবি মনে করে, তরঙ্গের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণে বাজারের আকার, মোট দেশজ উৎপাদনের ভিত্তিতে মাথাপিছু আয়, গ্রাহতপ্রতি রাজস্ব বা আরপু, জনসংখ্যাসহ কয়েকটি বিষয়কে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, শ্রীলঙ্কার মতো সমপর্যায়ের দেশগুলোতে এ ধরনের তরঙ্গের ভিত্তিমূল্য ৩৫ লাখ ডলার থেকে এক কোটি ডলারের বেশি নয়। সে হিসেবে বাংলাদেশে প্রস্তাবিত তরঙ্গের ভিত্তিমূল্য এক কোটি ডলারের মধ্যে থাকা উচিত।
রবির মুখপাত্র মহিউদ্দিন বাবর প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রস্তাবিত তরঙ্গের মূল্য এতটাই বেশি যে বিনিয়োগ করে তা ব্যবসায়িকভাবে কোনো লাভ আনবে না।’
মুঠোফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব) বলছে, টেলিযোগাযোগ খাতের ঝুলে থাকা কয়েকটি বিষয়ের সমাধান না হলে নতুন তরঙ্গ নিলামে অন্য অপারেটররা অংশ নাও নিতে পারে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সিম প্রতিস্থাপন কর, স্পেকট্রাম কেনার সময় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাতিল, তরঙ্গ ব্যবহারে স্বাধীনতা, তরঙ্গ নীতিমালা ও বিদ্যমান টেলিযোগাযোগ আইন সংস্কার।
সম্ভাব্য নিলামের প্রক্রিয়া ও শর্ত নিয়ে গত ১৯ জানুয়ারি মুঠোফোন কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধি, বিটিআরসি, অ্যামটবের সঙ্গে বৈঠক করেছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। নিলামের প্রস্তাবিত নীতিমালা অপারেটরদের সরবরাহ করেছে মন্ত্রণালয়। প্রতিক্রিয়া জানাতে কোম্পানিগুলোকে সময়ও দেওয়া হয়েছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে অ্যামটব এক চিঠিতে এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।
নিলামের প্রস্তাবিত মেগাহার্টজ তরঙ্গের ভিত্তিমূল্য প্রসঙ্গে অ্যামটব মহাসচিব টি আই এম নুরুল কবির বলেন, ‘স্পেকট্রাম কেনাটাই শেষ কথা নয়। তা ব্যবহারের জন্য অবকাঠামো নির্মাণসহ অন্যান্য কাজে আরও অনেক অর্থ বিনিযোগ করতে হবে। অনিশ্চিত বিনিয়োগ পরিবেশে যে ভিত্তিমূল্য প্রস্তাব করা হয়েছে তা অনেক বেশি।’
প্রস্তাবিত নিলামপ্রক্রিয়া নিয়ে জানতে চাওয়া হলে বিটিআরসির সচিব ও মুখপাত্র সরওয়ার আলম বলেন, ‘স্পেকট্রাম সীমিত ও মূল্যবান সম্পদ। গ্রাহক স্বার্থের কথা মাথায় রেখে কম খরচে উন্নত মানের সেবা, ভবিষ্যতের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষমতার কথা মাথায় রেখে তরঙ্গের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’
টুজি নিলামে গ্রামীণফোনের অংশ নিতে না পারার ব্যাপারে সারওয়ার আলম বলেন, ‘টেলিযোগাযোগ খাতের অভিভাবক সংস্থা হিসেবে অপারেটরদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সমতাভিত্তিক বাজার নিশ্চিত করা বিটিআরসির দায়িত্ব। এখানে কারও প্রতি বৈষম্য করা হয়নি। প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে তরঙ্গ ব্যবহারে প্রযুক্তি নিরপেক্ষতার অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিটিআরসির বিবেচনায় আছে।’

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন