ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আদালতের পরিবর্তে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারে (বিয়াক) মানুষ তেমন আসছে না। তিন বছরে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিয়াকে এসেছে মাত্র ১২৯টি মামলা; যা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।
ঢাকায় সচিবালয়ে গতকাল সোমবার বিয়াক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এক বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাংবাদিকদের কাছে কিছুটা হতাশার সুরেই এ তথ্য জানান।
প্রতিনিধিদলটির নেতৃত্ব দেন বিয়াক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান। এ সময় বিয়াক কাউন্সিলের তিন সদস্য আইসিসিবির সহসভাপতি লতিফুর রহমান, মেট্রো চেম্বারের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর ও ঢাকা চেম্বারের সভাপতি হোসেন খালেদ উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও আইসিসিবির আরেক সহসভাপতি রোকিয়া আফজাল রহমান, পুবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হাফিজ আহম্মদ মজুমদার, আমেরিকান চেম্বার ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সভাপতি আফতাব-উল ইসলাম, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, বিয়াকের প্রধান নির্বাহী তৌফিক আলী ও পরিচালক এ এইচ এম নূরুল ইসলাম।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘তাঁরা বলেছেন যে, তাঁরা যাতে ব্যস্ত থাকতে পারেন, সরকারের পক্ষ থেকে সে রকম একটা ব্যবস্থা করতে। অফিস কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তাঁদের অর্থ দরকার। আসলে যে উদ্দেশ্য নিয়ে এটা গঠিত হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি।’
সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ দেশে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যাপক সম্ভাবনা থাকার কথা অর্থমন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী মনে করেন, সংস্থাটির প্রচারণা কম। এ ব্যাপারে তাদের আরও জোর দিতে হবে।
উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘একশ্রেণির লোক হয়তো মনে করেন আদালতে থাকলেই ভালো এবং বিরোধ দীর্ঘায়িত হলেই তাঁদের লাভ।’
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘একটি প্যারোডির কথা মনে পড়ছে। মামলার ডাকে তারা ঘুমিয়ে পড়ে, মামলার ডাকে জাগে।’
বৈঠকের পর যোগাযোগ করলে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি হোসেন খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি আকৃষ্ট করতে কিছু নীতির পরিবর্তন করতে হবে। এমন বাধ্যবাধকতা আনতে হবে যে, আগে আরবিট্রেশনে (সালিস) আসতে হবে। তারপর কেউ চাইলে অর্থঋণ আদালত বা আদালতে যেতে পারেন। অর্থমন্ত্রীর কাছে এই বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান তিনি।
কী পরিমাণ বাণিজ্যবিষয়ক মামলা বিয়াকে আসতে পারত, কিন্তু আসেনি—জানতে চাইলে বিয়াকের প্রধান নির্বাহী তৌফিক আলী প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে নির্দ্বিধায় বলা যায়, লাখ লাখ মামলা আসতে পারত।
দেশে ২০১১ সালের এপ্রিল থেকে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে বিয়াক। হংকং, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি দেশে বিয়াকের মতো প্রতিষ্ঠান সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আসছে বলে বিয়াকের কর্মকর্তারা জানান।
কৃষকসমাজ পথে বসে গেছে: এক সপ্তাহ আগে হরতাল-অবরোধে জেলা পর্যায়ের পরিস্থিতি মারাত্মক বলে মন্তব্য করেছিলেন, এখন কী বলবেন—এমন এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় কৃষকসমাজ পথে বসে গেছে। তাদের উৎপাদন ও সবজি পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।
মফস্বল এলাকায় বিপর্যয় নেমে এসেছে উল্লেখ করে মুহিত বলেন, পরিস্থিতির একটু উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু মুক্ত পরিবহনব্যবস্থা এখনো ফিরে আসেনি।
হরতাল-অবরোধে ক্ষতি হওয়ার কথা বলে পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ নিশ্চয়ই সরকারের কাছে সুবিধা চাইবে। সরকার এ ব্যাপারে কোনো হিসাব করেছে কি না, জানতে চাইলে মুহিত বলেন, ‘বিজিএমইএ কোনো দুর্ভোগে পড়েনি। এটা আমার মনে হয়। কারখানায় উৎপাদন চলছে। কিছুই বন্ধ নেই। তবে দেশের সহিংস পরিস্থিতির কারণে তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।’
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নাগরিক সমাজের উদ্যোগ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিককে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি মনে করছেন? কতটুকু মনে করছেন যে, সংলাপের দরকার রয়েছে?’
দেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য বিএনপিকে দায়ী করার পাশাপাশি দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ইঙ্গিত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘একটি দেশকে একজন মহিলা জিম্মি করে রেখেছেন।’ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের প্রধান দায়িত্ব বিএনপিরই বলে মনে করেন মুহিত।

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন