ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ সম্পর্কে আইপিডিসি ফাইন্যান্সের কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে বলছেন, করোনা অতিমারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সময় দেশে অস্বাভাবিক হারে বাল্যবিবাহ বেড়েছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে পরিবারগুলোর অভিভাবকেরা তাঁদের আর্থিক অনিশ্চয়তার কথাই বলেছেন। তাই এ ধরনের পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিনা সুদে ঋণ প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে আইপিডিসি।

রোজার ঈদের পর ঋণ বিতরণ শুরু হবে। ঋণ নেওয়া পরিবারের যখন আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে, তখন থেকে তারা তা পরিশোধ করতে পারবে।
মমিনুল ইসলাম, সিইও, আইপিডিসি ফাইন্যান্স

একাধিক বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) জরিপে দেখা গেছে, দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর বিভিন্ন জেলায় বাল্যবিবাহের ঘটনা বেড়েছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের এক জরিপে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে করোনার মধ্যে ৭ মাসে দেশের ২১ জেলার ৮৪ উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিবাহ হয়েছে। কারণ, করোনায় মানুষের আয় কমে গেলেও খরচ কমেনি। এই বাড়তি খরচ মেটাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহের প্রবণতা বেড়েছে।

একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, আর্থিক খরচ কমাতে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন অনেক অভিভাবক। এই সমস্যার সমাধানে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আমাল ফাউন্ডেশন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি ফাইন্যান্স এগিয়ে এসেছে। বাল্যবিবাহ ঠেকাতে প্রতিষ্ঠান দুটি গরিবদের মধ্যে বিনা সুদের ঋণ বিতরণ করছে।

জানতে চাইলে আইপিডিসি ফাইন্যান্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনা মহামারির সময়ে আমরা দেশে বাল্যবিবাহের হার বেড়ে যেতে দেখেছি। পরিবারে আয়ের উৎস না থাকায় বাল্যবিবাহের ঘটনা বাড়ছে। আবার অনেক পরিবার মেয়েকে বোঝা মনে করে বলে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে।’

মমিনুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমরা প্রথম পর্যায়ে ৫০ পরিবারকে বিনা সুদে ঋণ দেব। রোজার ঈদের পর ঋণ বিতরণ শুরু হবে। ঋণ নেওয়া পরিবারের যখন আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে, তখন থেকে তারা তা পরিশোধ করতে পারবে।’

আইপিডিসি বলছে, সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলো বিনা সুদের এই ঋণের টাকায় সেলাই মেশিন বা গরু–ছাগল কিনতে কিংবা দোকান খুলে ব্যবসা করতে পারবেন।

প্রথম দফায় গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটকে বাছাই করার বিষয়ে আইপিডিসির বক্তব্য হলো, এই তিন জেলা অপেক্ষাকৃত দারিদ্র্যপ্রবণ। জেলাগুলোতে শিক্ষার হার কম, বাল্যবিবাহের হার তুলনামূলক বেশি। সে জন্য প্রথমেই এ তিন জেলাকে বাছাই করা হয়েছে।

তবে বিনা সুদের হলেও এই ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত মানতে হবে গ্রহীতাদের। প্রথমত, ঋণের জন্য আবেদনকারীর মেয়েসন্তানের বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে হতে হবে এবং সেই মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে তাকে বিয়ে দেওয়া যাবে না। কন্যাসন্তানের সর্বনিম্ন উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ঋণের টাকায় ব্যবসা করতে হবে। ব্যবসায় লাভ হওয়ার পর ঋণের টাকা পরিশোধ করা যাবে। অথবা মেয়েসন্তান চাকরি পাওয়ার পর থেকেও ঋণের টাকা পরিশোধের সুযোগ থাকবে।

ঋণপ্রাপ্তির পর আমাল ফাউন্ডেশন আবেদনকারীকে নিজস্ব ব্যবসা গড়ে তোলার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা পেতে সহযোগিতা করবে।

আইপিডিসি জানিয়েছে, এভাবে প্রতিবছর তারা পাঁচ হাজার মেয়েকে স্বাবলম্বী করতে চায়। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজে মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম হবে। সেই সঙ্গে তাদের পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থারও উন্নতি ঘটবে। ফলে মেয়েসন্তানদের বোঝা হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাবে।

আইপিডিসি ফাইন্যান্সের সিইও মমিনুল ইসলাম বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে বিনা সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এর আগেও আইপিডিসি ফাইন্যান্স সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে অভিনব ও ব্যতিক্রমী বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বাল্যবিবাহ ঠেকাতে ঋণ কার্যক্রম তারই ধারাবাহিকতা।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন