কৃষি, শিল্প, নির্মাণ, বিদ্যুৎ—এমনকি সেবা খাতও ভালোই চলছিল। রপ্তানি ও প্রবাসী-আয়, বৈদেশিক সাহায্য ও বিনিয়োগ আসার পরিমাণও ছিল তুলনামূলক ইতিবাচক। খাদ্য মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছিল ২৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্নে। মুদ্রা বিনিময় হারও ছিল স্থিতিশীল।
চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) এই যখন ছিল অবস্থা, ঠিক এর পরই দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া চলমান হরতাল-অবরোধসহ রাজনৈতিক অস্থিরতা এ অনিশ্চয়তার জন্য দায়ী। ফলে অর্থনীতির সব সূচকেই আগামী দিনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বেসরকারি খাতে গতি আনা ছাড়া যেহেতু কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়, সেহেতু কীভাবে তা আসতে পারে, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) নিয়মিত ত্রৈমাসিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় এমন বিশ্লেষণ উঠে এসেছে। গতকাল শনিবার মেট্রো চেম্বার এই পর্যালোচনাটি প্রকাশ করেছে।
এতে সংগঠনটি বলেছে, অর্থনীতিতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রভাব পড়ার কারণে সরকারকে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমাতে হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যেই পূর্বাভাস দিয়েছে, এ বছরে জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির হার হবে ৬ দশমিক ৫ থেকে ৬ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অবশ্য প্রক্ষেপণ করেছে আরও কম অর্থাৎ ৬ দশমিক ২ থেকে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব সংগ্রহে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে তা অনেক কম। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়িত হয়েছে ২৮ শতাংশ, যা আগেরবারের একই সময়ের তুলনায় ১ শতাংশ বেশি। আগের বছরের তুলনায় এবারের জুলাই-নভেম্বরে আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ১ শতাংশ। আগেরবারের হরতাল-অবরোধের ক্ষতি কাটিয়ে শিল্প খাত কিছুটা ঘুরেও দাঁড়িয়েছিল। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। পর্যালোচনায় এই বিশ্লেষণও তুলে ধরে এমসিসিআই।
সংগঠনটি বলেছে, প্রত্যাশিত হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন, মূল্যস্ফীতি নিম্ন পর্যায়ে রাখা এবং মধ্যম আয়ের দেশের পর্যায়ে উন্নীত হতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকা জরুরি।
এমসিসিআইয়ের মতে, নতুন অবকাঠামো তৈরি ও বিদ্যমান অবকাঠামোর উন্নয়ন ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কিছুতেই মধ্যম
আয়ের দেশ হওয়া যাবে না। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চলমান সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম দ্বৈত রেলপথ (ডাবললাইন), পদ্মা সেতু, ঢাকা মেট্রোরেল, বিবিয়ানা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করে মেট্রো চেম্বার। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বিনিয়োগ-সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে মনোযোগ দিতে হবে বলেও পর্যালোচনায় উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
মেট্রো চেম্বার আরও বলেছে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা। বেসরকারি খাতে গতি এনে অর্থনৈতিক কার্যক্রম কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় বা বিদেশি—উভয় ধরনের উদ্যোক্তার জন্যই দরকার সুষ্ঠু অর্থনৈতিক নীতি, ব্যবসায়ের অনুকূল পরিবেশ ও স্থিতিশীল রাজনীতি।

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন