কেনাকাটার উৎসব চলছে। যেন ঈদের বাজার। নতুন পোশাক কেনা তো আছেই, সঙ্গে আছে আরও অনেক কিছু। প্রতিবছরই বাড়ছে বৈশাখের কেনাকাটা। সব মিলিয়ে বৈশাখের অর্থনীতির কর্মকাণ্ডের পরিমাণ এখন ছয় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
প্রায় বছরজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হরতালের কারণে অর্থনীতিতে ছিল মন্দা। বিশেষ করে দোকানপাট বন্ধ থাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০১৩ সালে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ ১৪০ কোটি ডলার বা প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর রাজপথ শান্ত থাকলেও অর্থনীতির গতি শ্লথই রয়ে গেছে। এরই মধ্যে বৈশাখ-কেন্দ্রিক কেনাকাটা অর্থনীতিতে খানিকটা গতি আনতে পেরেছে।
একটা সময় পয়লা বৈশাখকে বরণ করে নেওয়ার এই আয়োজন ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। আর এর ওপর ভিত্তি করেই গ্রামীণ নানান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও বিকাশ হয়। কিন্তু ব্যস্ত নগরজীবনেও এখন নববর্ষকে বরণ করে নেওয়ার ছোঁয়া লেগেছে। গ্রামমুখী ওই উৎসব এখন হয়ে উঠেছে শহরমুখী। আর শহরের মানুষ এই উৎসবটি উদ্যাপন করছে নানাভাবে। আর সে কারণে কিছু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে নগরেও। এসবের ফলে দেশে পয়লা বৈশাখকেন্দ্রিক ছোটখাটো একটা অর্থনীতিও গড়ে উঠেছে। প্রতিবছরই বাড়ছে এসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। মুঠোফোনে কথা বলা থেকে শুরু করে ফ্ল্যাট পর্যন্ত অনেক কিছুতেই দেওয়া হচ্ছে লোভনীয় ‘বৈশাখী অফার’।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক নাজনীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বর্ষবরণের এই উৎসবটি একসময় ছিল শুধুই গ্রামাঞ্চলের উৎসব। এই উৎসবে এখন নগরের সম্পৃক্ততা বেড়েছে। ফলে নগরেও এখন গ্রামীণ লোকজ আমেজ জনপ্রিয় হচ্ছে। বৈশাখ উপলক্ষে তৈরি হওয়া শাড়ি, কুটিরশিল্প কিংবা খেলনায় থাকছে গ্রামীণ ছোঁয়া। এসব পণ্যের বাজারজাতকরণে বড় ভূমিকা রাখছে বৈশাখ। এতে এসব পণ্যের নগরকেন্দ্রিক বাজার গড়ে উঠেছে।
নাজনীন আহমেদ আরও বলেন, বৈশাখ উপলক্ষে শাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাকই হয়তো বিক্রি হবে আট শ থেকে এক হাজার কোটি টাকার। এর সঙ্গে চুড়ি, মাটির তৈরি পণ্য, কুটিরশিল্পসহ নানা পণ্য তো আছেই। বড় বিষয় হলো, এসব কাজে যত লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে তা হিসাব করা হলে এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ পাঁচ-ছয় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
একাধিক ফ্যাশন হাউসের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, সারা বছর তাঁদের যে ব্যবসা হয় তার অর্ধেকই হয় রোজার ঈদে। পয়লা বৈশাখে হয় প্রায় ২৫ শতাংশ। আর বাকিটা সারা বছর। দেশে এখন সাড়ে চার হাজারের মতো ফ্যাশন হাউস আছে। এর ৬০ শতাংশই গড়ে উঠেছে ঢাকা ও চট্টগ্রামে। আর এসব প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ আনুমানিক ছয় হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে পয়লা বৈশাখে হয় দেড় হাজার কোটি টাকা। এসব তথ্য ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফ্যাশন উদ্যোক্তা সমিতির (এফইএবি বা ফ্যাশন উদ্যোগ)।
উদ্যোক্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক অস্থিরতা, টানা হরতাল ও অবরোধের কারণে গত বছর লোকসানের মুখে থাকা ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশাখের বিক্রিতে এখন বেশ চাঙা হয়ে উঠেছে। সামনে আছে রোজার ঈদ।
ফ্যাশন উদ্যোগ সভাপতি আজহারুল হকের দাবি, গত বছরের চেয়ে এবার ৩০ শতাংশ বিক্রি বেশি হয়েছে। অথচ রাজনৈতিক অস্থিরতায় গেল বছর মানুষ আগ্রহ দেখায়নি।
ফ্যাশন হাউস রঙ-এর অন্যতম কর্ণধার সৌমিক দাস প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক বছর আগেও নববর্ষের আগে সপ্তাহ খানেক এই ব্যবসা হতো। আর এখন ব্যবসা চলে প্রায় ২০-২৫ দিন।
বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে পান্তা-ইলিশ। আর এই পান্তা-ইলিশ খাওয়ার জন্য চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে বাজারে ইলিশ কেনার ধুম পড়ে যায়। ইলিশের এই ‘নগরকেন্দ্রিক’ চাহিদাকে পুঁজি করে তাই ফায়দা লোটেন পাইকারি ও খুচরা মাছ ব্যবসায়ীরা। হিমায়িত ইলিশও তাজা ইলিশ বলে চালিয়ে দেন, আর ক্রেতার কাছ থেকে হাতিয়ে নেন কয়েক গুণ বেশি টাকা।
কারওয়ান বাজারে শুক্র ও শনিবার এক কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের হালি আট হাজার ও এক কেজি ওজনের ইলিশের হালি ছয় হাজার টাকা হাঁকাতে দেখা গেছে। দাম বেশি কেন জানতে চাইবেন, তো শুনবেন, ‘পদ্মার তাজা ইলিশ। তাই দাম একটু বেশি। নিলে ঠকবেন না।’
ঢাকা মহানগর মাছ ও কাঁচাবাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন শিকদার বলেন, এক কেজি ওজনের এক মণ ইলিশ মাস খানেক আগেও ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকায়। মাঝারি ইলিশের (৫০০-৬০০ গ্রাম) মণ এখন ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা।
তবে ইলিশের বিকিকিনি এখন আর শুধু কাঁচাবাজারে সীমিত নেই। বিক্রি হয় নানান সুপার শপেও। তাদের ইলিশের প্রতি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে নানা ছাড়ের ঘোষণাও দিয়েছে সুপার শপগুলো। অনলাইনেও এখন বিক্রি হচ্ছে এই ‘বৈশাখী ইলিশ’।
আবার পয়লা বৈশাখের দিন এই পান্তা-ইলিশের ব্যবসাও হয় জমজমাট। একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, শহীদ মিনারকেন্দ্রিক এই পান্তা-ইলিশ খাওয়ানোর ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা এখন ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর প্রায় সব রেস্তোরাঁয়ও। আর এই পান্তা-ইলিশ চড়া দামে খেয়েও যেন তৃপ্ত নগরবাসী।
একসময় বৈশাখের প্রথম দিনটিতে পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা হালখাতা খুলে নতুন বছরটিকে স্বাগত জানাতেন। কালের আবর্তে আজ সেই হালখাতা প্রায় হারিয়ে যেতে বসলেও মিষ্টি দিয়ে দিনটি বরণ করতে ভোলেন না এই ব্যবসায়ীরা। সে কারণে পয়লা বৈশাখে মিষ্টির ব্যবসাও এখন কম রমরমা নয়।
সুইটস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, স্বাভাবিক সময়ে একটা দোকানে প্রতিদিন যত মিষ্টি বিক্রি হয়, এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন তার তিন গুণ বিক্রি হয়। আর পয়লা বৈশাখের বিক্রি দ্বিগুণ।
নববর্ষের প্রথম দিনটি ঘিরে নানা ধরনের শুভেচ্ছাকার্ড ও বাংলা নববর্ষের ক্যালেন্ডার অন্যকে উপহার দেওয়ার রেওয়াজও চালু আছে অনেক দিন থেকেই। মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানগুলোর (প্রিন্টিং প্রেস) ব্যবসাও মন্দ নয়। এর সঙ্গে কয়েক বছর ধরে যুক্ত হয়েছে মাথায় পরার কাগজের টুপি এবং বিভিন্ন বৈশাখী বইমেলার জন্য বই ছাপানো। দেশে এখন সব মিলিয়ে মুদ্রণপ্রতিষ্ঠান আছে সাত হাজার।
এসবের মধ্য দিয়ে এ বছর সারা দেশের মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানগুলোর পয়লা বৈশাখকেন্দ্রিক আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে ধারণা করছেন বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম শাহ আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তিন-চার বছর আগেও পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে ব্যবসার পরিমাণ ছিল আনুমানিক পাঁচ থেকে সাত কোটি টাকা। এটা ক্রমেই বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0