জানা গেছে, চট্টগ্রামের বিএসএম গ্রুপ তিন মাস আগে ঋণপত্র (ডেফার্ড এলসি) খুলে মসুর ডাল আমদানি করে। তখন প্রতি ডলারের দাম ধরা হয় ৮৫ টাকা। গম আমদানিতে প্রতি কেজিতে দাম পড়ে ৭৯ টাকা, বিক্রি করে ৮০-৮১ টাকা দরে। এখন সেই ঋণপত্রের দায় শোধ করতে প্রতি ডলারে গ্রুপটিকে দিতে হচ্ছে ৯৬ টাকা। এতে সেই মসুর ডালের খরচসহ দাম পড়ছে ৮৯-৯০ টাকা। তবে আগেই বিক্রি করে দেওয়ায় এখন মসুর ডালে লোকসান গুনছে গ্রুপটি। একই অবস্থা গম আমদানির ক্ষেত্রেও।

চট্টগ্রামের বিএসএম গ্রুপের মতো প্রায় সব ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক একই সমস্যায় পড়েছেন। একই সঙ্গে পোশাক, রড, সিমেন্টের কাঁচামাল, ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন খাতের আমদানিনির্ভর ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বিপাকে। যার প্রভাব এখন পড়ছে পণ্যের দামে। যাঁরা পণ্য বিক্রি করে দিয়েছেন, তাঁরা দাম বাড়ানোর সুবিধা নিতে পারছেন না।

চট্টগ্রামের অন্যতম আমদানিকারক ও বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিক্রি করা গম, মসুর ডালসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যে এখন লোকসান গুনতে হচ্ছে। এখন নতুন করে ঋণপত্র খুলতে ভয় পাচ্ছি। ব্যবসাজীবনে আগে কখনো এমনটা হয়নি।’

বিএসএমের মতো সমস্যায় পড়েছে ক্রাউন সিমেন্ট ও জিপিএইচ ইস্পাত। প্রতিষ্ঠান দুটি তিন মাস আগে প্রতি ডলার ৮৭ টাকা দরে কাঁচামাল আমদানি করেছে, সেই পণ্য বিক্রিও করে দিয়েছে। এখন প্রতি ডলারে গুনতে হচ্ছে ৯৫ টাকা ১৫ পয়সা। গত বুধবার যা ছিল ৯৪ টাকা ৯০ পয়সা।

সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর মালিকদের সংগঠন বিসিএমএ ও জিপিএইচ ইস্পাতের চেয়ারম্যান আলমগীর কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমদানির বিপরীতে ডলারের মূল্য পরিশোধের জন্য এতটা চাপে গত ১০ বছরের মধ্যে পড়তে হয়নি। বিভিন্ন ব্যাংকে ডলারের মূল্যের হেরফের হচ্ছে। এমনকি একটি ব্যাংক ডলারের দাম দেওয়ার পরের এক ঘণ্টার মধ্যেই সেটা পরিবর্তন করছে অথবা পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বাধ্য হয়ে অন্য ব্যাংকের কাছে ধরনা দিতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এখানে কারও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কী হচ্ছে আমরা বুঝতে পারছি না। এ জন্য নতুন করে আমদানি ঋণপত্র খোলার বিষয়ে আমরা শঙ্কিত।’

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, মূলধনি যন্ত্রের জন্য এক বছরে বিলম্বে বিল পরিশোধে ঋণপত্র খোলা যায়। কাঁচামালের ক্ষেত্রে বিলম্বের মেয়াদ ছয় মাস এবং ওষুধ, সার, কীটনাশক আমদানির জন্য তিন মাস। তবে করোনার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দফায় দফায় আমদানি বিল পরিশোধের মেয়াদ বাড়ায়। ফলে আমদানিকারকেরা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বিল পরিশোধে দ্বিগুণ সময় পান। এসব আমদানিকারক পড়েছেন সবচেয়ে বিপাকে। কারণ, ৮৫ টাকার ঋণপত্রে এখন তাঁদের ৯৫ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।

প্লাস্টিক খাতের ব্যবসায়ী সৈয়দ নাসির প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঈদের এক সপ্তাহ আগে প্রতি ডলার ৯১ টাকা ৩০ পয়সা দরে কাঁচামাল আমদানি করেছি। এখন লাগছে ৯৫ টাকা। খরচ বাড়ায় এখন ক্রেতাদের সঙ্গে দাম বাড়ানোর জন্য যোগাযোগ করছি। কেউ রাজি হচ্ছে, কেউ হচ্ছে না। অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি।’

বাংলাদেশে এমনিতে প্রতি মাসে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে আমদানি দায় শোধ হয় না। এর মধ্যে আমদানি খরচ বেড়েছে ৪৬ শতাংশ, আর রপ্তানি আয় বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। এদিকে প্রবাসী আয় কমেছে ১৬ শতাংশের বেশি। এতে সংকট আরও বেড়েছে। এর ফলে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে। গত বছরের ৩০ জুন রিজার্ভ ছিল ৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলার, এখন যা কমে হয়েছে ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার।

ডলারের সংকট মোকাবিলায় নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিলাসপণ্য আমদানি ঠেকাতে গাড়ি ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের ঋণপত্রে নগদ জমার হার বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করে দিয়েছে সরকার।

এদিকে ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও খোলাবাজারে ডলারের দাম বাড়ছে। গতকাল যা বেড়ে হয়েছে ৯৪ টাকা ৫০ পয়সা। এর ফলে বিদেশগামী যাত্রী, রোগী ও পর্যটকদের খরচ বেড়ে গেছে।

খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আমদানি বাড়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের দাম বাড়ছে। এ জন্য রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বাড়াতে বড় উদ্যোগ নিতে হবে। আর খোলাবাজারে সংকট কাটাতে কেউ যাতে সীমার বেশি নগদ ডলার বিদেশে নিতে না পারেন বা মজুত করতে না পারেন, তার তদারকি জোরদার করতে হবে।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন