বড় পরিবর্তন আসবে গাড়িশিল্পে

একজন শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে এবারের বাজেটে আমার কাছে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত মনে হয়েছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ঘোষণাটি। আমাদের দেশীয় অনেক উদ্যোক্তা ঝুঁকি নিয়ে দেশে পণ্য তৈরিতে বড় বিনিয়োগ করছেন। অনেক পণ্যের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দিয়েছে দেশে তৈরি পণ্য। এখন দরকার দেশে-বিদেশে বাংলাদেশি পণ্যের ব্র্যান্ডিং ও স্বীকৃতি।

ইলেকট্রনিকস ও গাড়িশিল্পে আমাদের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। এ দুটি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে এবারের বাজেটে বেশ কিছু সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। এ খাতের উদ্যোক্তা হিসেবে আমি মনে করি, এসব পদক্ষেপ এ খাতকে ভবিষ্যতে অনেক দূর এগিয়ে নেবে।

উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, স্মার্টফোনের কথা। বর্তমানে স্মার্টফোনের বাজারের ৮৫ শতাংশই দেশে তৈরি হচ্ছে। এ বছর শেষে ৯০ শতাংশ বাজারই দেশে তৈরি স্মার্টফোনের দখলে চলে আসবে বলে আশা করছি। স্মার্টফোনের মাদারবোর্ডও এখন আমরা দেশে তৈরি করছি। এবারের বাজেটে মোবাইল ফোনের ব্যাটারি তৈরির ক্ষেত্রে কর ছাড়ের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি, এর ফলে কয়েক বছরের মধ্যে দেশেই মোবাইল ফোনের ব্যাটারি তৈরির কারখানা স্থাপনে বড় বিনিয়োগ আসবে। এ ছাড়া রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, টেলিভিশনের পশ্চাৎ শিল্প বা ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্পে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতেও এবারের বাজেটে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।

এবারের বাজেটে মেড ইন বাংলাদেশ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠায় দেশে অটোমোবাইল খাতের থ্রি-হুইলার ও ফোর-হুইলার উৎপাদনকারী কোম্পানিকে শর্ত সাপেক্ষে ১০ বছরের জন্য কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সেটি আরও কিছু শর্ত সাপেক্ষে আরও ১০ বছর বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিছু ইলেকট্রনিকস গৃহস্থালি সামগ্রী, হালকা প্রকৌশল শিল্প পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিকে কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার ও কম্প্রেসর উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা এক বছর এবং মোটর কার ও মোটর ভেহিক্যালের ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা পাঁচ বছর বাড়ানো হয়েছে। আমি মনে করি, এর ফলে দেশে গাড়ি উৎপাদন ও সংযোজন কারখানায় বিনিয়োগ বাড়বে। যাঁরা এরই মধ্যে এ খাতে বিনিয়োগ করেছেন, তাঁরা উপকৃত হবেন। এতে কর্মসংস্থানও বাড়বে। আমরা এরই মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ির ইকো সিস্টেম ও গাড়ি তৈরিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে যাচ্ছি। সরকারের দেওয়া কর সুবিধা এ বিনিয়োগকে সুরক্ষা দেবে। আমি মনে করি, সরকারের দেওয়া নানা সুবিধার কারণে অটোমোবাইল খাতটি সম্ভাবনাময় খাত হয়ে উঠছে। এ খাতে অনেকেই বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন। এ খাতের একজন উদ্যোক্তা হিসেবে বলতে পারি, আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের অটোমোবাইল খাতে বৈপ্লবিক এক পরিবর্তন আসবে। আমদানিনির্ভরতা কমে যাবে।

আমি মনে করি, এরই মধ্যে আমরা মেড ইন বাংলাদেশ পণ্যের বাজার তৈরি করে ফেলেছি। আগামী দিনগুলোতে এ অগ্রযাত্রা আরও বেগবান হবে। তাই দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়বে বলে আমার ধারণা। তবে এ কথা মনে রাখতে হবে, একটি কোম্পানি কখনো সবকিছু তৈরি করবে না। সেটি বাস্তবসম্মতও নয়।

একজন শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী হিসেবে বাজেটে করপোরেট কর কমানোর ঘোষণাকে স্বাগত জানাই। করহার যত বেশি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা যাবে, কর আদায় তত বেশি বাড়বে। কিন্তু যখনই কর বাড়িয়ে করদাতার ওপর চাপ বাড়ানো হয়, তখনই কর না দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এবারের বাজেটে দুই লাখ টাকা বা তার বেশি অর্থের সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমি মনে করি, এটা ঠিক আছে। এর ফলে কর জালের আওতা বাড়বে। কারণ, অনেক সম্পদশালী ব্যক্তি সঞ্চয়পত্রে বড় ধরনের বিনিয়োগ করে রেখেছেন। তাই এ খাতে স্বচ্ছতা আনা দরকার।