ইউএন এসকাপের প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি

ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ

বিজ্ঞাপন

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের যে কয়টা দেশ অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির দিক থেকে পেছনের সারিতে আছে তার একটি বাংলাদেশ। তবে এই তালিকায় বাংলাদেশের চেয়েও পিছিয়ে আছে ভারত ও পাকিস্তান।
এই তথ্য জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইউএন এসকাপ) এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অন্তর্ভুক্তির একটি সূচক থেকে পাওয়া। আর এসকাপের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জরিপ-২০১৫ তে এই সূচকটির উল্লেখ রয়েছে।
৫৩টি সদস্য দেশ থাকলেও প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ায় ইউএন এসকাপ ১৬টি দেশ নিয়েই সূচকটি তৈরি করেছে। এই তালিকায় শেষ নামটি পাকিস্তানের। সবার ওপরে কাজাখস্তান। ১৯৯০-৯৯ পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ এ তালিকায় ১২তম অবস্থানে ছিল। এখনো (২০০০-২০১২) তা-ই। তবে এই সময়ে ভারত ১৩তম থেকে ১৪তম স্থানে নেমে গেছে।
এসকাপের সদস্য দেশগুলোতে গতকাল বৃহস্পতিবার একযোগে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। ঢাকায় জাতিসংঘ তথ্যকেন্দ্র (ইউএনআইসি) ও জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের (ইউএনআরসি) কার্যালয়ের আয়োজনে রাজধানীর আইডিবি ভবনে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ইউএন এসকাপের প্রধান কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সৈয়দ এ এম নুরুজ্জামান। তিনি জানান, বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্তি সূচকে বেশ ভালো করেছে। তবে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ হলো অধিক জনসংখ্যার একটি ছোট দেশ। তাই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ যেমন এ দেশের বিরাট পরিবর্তন আনতে পারে। তেমনি একটি নেতিবাচক পদক্ষেপও অনেক পিছিয়ে দিতে পারে।
প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, চীনসহ এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর বেশির ভাগের অর্থনীতি বহির্বিশ্বের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতির ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই অভ্যন্তরীণ ভোগের ওপর নির্ভর করে। সে কারণে বিশ্বমন্দা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আক্রান্ত করতে পারেনি।
প্রতিবেদন বলছে, সরকারি তথ্যে বাংলাদেশে বেকার মানুষের সংখ্যা খুবই কম। তবে নাজুক কর্মসংস্থানের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেশি (৮০ শতাংশের ওপরে)। সৈয়দ নুরুজ্জামান বলেন, একটি সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক অভিঘাত তাদের বড় অংশকে বেকার করে দিতে পারে।
সামাজিক অন্তর্ভুক্তি প্রসঙ্গে এসকাপ বলছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। আবার এই অঞ্চলের ১৩টি দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের ৫০ শতাংশই মানুষকে বহন করতে হয়। বাংলাদেশে ৬০ শতাংশের বেশি মানুষকে নিজের পকেট থেকেই চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হয়। এসকাপ বলছে, এই ব্যয় বহনের সক্ষমতা না থাকায় অনেকেই চিকিৎসাসেবা নিতে চান না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অন্তত ৬২ কোটি মানুষ বিদ্যুতের আওতায় আসেনি। আবার শহর ও গ্রামে বিদ্যুৎ-সেবা নিয়েও বৈষম্য আছে। যেমন বাংলাদেশে শহরের ৯০ শতাংশের মতো মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এসেছে, যা অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের সমান। তবে গ্রামের মাত্র ৪৫ শতাংশের মতো মানুষ বিদ্যুতের আওতায় রয়েছে। গ্রামের মানুষদের বিদ্যুৎ-সেবা দেওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতিবেদনে এসকাপ বেশ কিছু সুপারিশও করেছে। এর মধ্যে আছে গ্রামকে অবহেলা না করা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে শক্তিশালী করা, প্রতিরক্ষা-জ্বালানি খাতে ভর্তুকির মতো অনুন্নয়ন ব্যয় কমানো, মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষা খাতে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো।
অনুষ্ঠানের অতিথি বাংলাদেশে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) পরিচালক পলিন টেমাসিস বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশ ভালো করেছে। অন্য দেশের জন্য যা ছিল কঠিন, তা-ই করে দেখিয়েছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে সামাজিক ও মানবসম্পদের উন্নয়নের দিক থেকে ভারত-পাকিস্তানের চেয়েও ভালো করেছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ৪ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। আর ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে রয়েছে। এই দারিদ্র্য কমাতে হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ বলেন, প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন, অবকাঠামোর মান, শিক্ষার মান, জ্বালানি সক্ষমতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকলেও সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে।
ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তাকে এ দেশের জন্য বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন মুরশিদ। তিনি বলেন, ‘এমডিজির (সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) মতো এসডিজির (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) লক্ষ্য অর্জনেও নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি আসবে। কিন্তু সবগুলো আমরা পাব না। তাই নিজেদের সামর্থ্যেই আমাদের লক্ষ্য পূরণ করতে হবে।’
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইউএনআইসির কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন