>দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির সমস্যা তুলে ধরা এবং সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটির নতুন সভাপতি শামস মাহমুদ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি ও নিজের পরিকল্পনা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজীব আহমেদ।
default-image

প্রথম আলো: ঢাকা চেম্বারে যখন আপনি দায়িত্ব নিলেন, তখন অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচকই নেতিবাচক। আপনার চোখে এখন অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ কী?
শামস মাহমুদ: এখন বিশ্বায়নের যুগ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্ব, ইউরোপের অর্থনীতির গতি হারানো, চীনের করোনাভাইরাস—সবকিছুই আমাদের চিন্তার বিষয়। কারণ, আমরা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত। অবশ্য এ ধরনের চ্যালেঞ্জ প্রতিনিয়ত আসবে, সেগুলো মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হবে। মোটাদাগে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসরমাণ দেশ। স্বল্পমেয়াদি বিবেচনায় সরকারের উচ্চ হারে ঋণ নেওয়ার মতো কিছু বিষয় হয়তো থাকবে।

প্রথম আলো: আমরা দেখছি সরকারি ঋণ বাড়ছে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর কারণ কী কী?
শামস মাহমুদ: একেকজন একেক রকম ব্যাখ্যা দেন। আমাকে যদি ব্যক্তিগত মত জিজ্ঞেস করেন, আমি বলব যখন মন্দা চলে, তখনই বিনিয়োগের সবচেয়ে ভালো সময়। তখন যদি বিনিয়োগ করে লাভ-লোকসান সমান রাখা যায়, পরিস্থিতি তার চেয়ে আর খারাপ হবে না, বরং ভালোর আশা থাকবে। এখন বিশ্বব্যাপী একটা মন্দার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। রপ্তানি খাতে এর প্রভাব পড়বেই। অভ্যন্তরীণ খাত একটা রূপান্তরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। আগে আমরা শুধু উৎপাদন ক্ষমতা ও ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করতাম। এখন টেকসই করা, মুনাফা বাড়ানোর দিকে বেশি নজর দিচ্ছি। সবাই দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে চাইছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগে গ্যাসের সমস্যা ছিল, সেটা কিন্তু কেটেছে।

প্রথম আলো: উদ্যোক্তাদের কি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কথাটিও মাথায় রাখতে হচ্ছে?
শামস মাহমুদ: আমার তো মনে হয় সময় এসে গেছে। আগে যেখানে আমরা ১০০ জন লোক লাগিয়ে একটি কাজ করতাম, এখন ২০ জন দিয়ে করছি। রোবটও আসছে। সরকার বিষয়টি জানে বলেই দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ করেছে।

প্রথম আলো: আমরা দেখছি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাত মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট) নিয়ে সমস্যায় আছে। আপনাদের কি কোনো সুপারিশ আছে?

শামস মাহমুদ: আমরা ঢাকা চেম্বার থেকে ৫ কোটি টাকার নিচের লেনদেন বা টার্নওভারের কোম্পানির ক্ষেত্রে নিরীক্ষা মান বা কমপ্লায়েন্সের দিক দিয়ে কিছুটা শিথিলতা চেয়েছি। এতে এসএমই খাত সুবিধা পাবে। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো যাদের কাছ থেকে কাঁচামাল কেনে, তারা ভ্যাট চালান দিতে পারে না। ফলে ছোটরা রেয়াত পায় না। আবার ১৫ শতাংশের নিচে ভ্যাট হার হলে রেয়াত নেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা চাই সব ক্ষেত্রে রেয়াত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক, যদি সেটা ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন হয়।

প্রথম আলো: ঢাকা চেম্বার পুরান ঢাকার পাইকারি ব্যবসায়ীদের বড় প্রতিনিধিত্বকারী একটি সংগঠন। তাঁদের সমস্যা আপনাদের চোখে পড়ছে?

শামস মাহমুদ: পুরান ঢাকাসহ পাইকারি ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়ছেন। ধরেন, ভ্যাটের কারণে বাড়তি দাম চাইলে ক্রেতারা কিনতে রাজি হন না। সব মিলিয়ে ব্যবসার গতি কিছুটা কমেছে। ব্যবসা ভ্যাট আইন বাস্তবায়নকালীন একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাইব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুরান ঢাকাসহ পাইকারি বাজারগুলোতে সচেতনতা কর্মসূচি করুক। ভ্যাটের ফরমও আরও সহজবোধ্য করা উচিত।

প্রথম আলো: রপ্তানি আয় কমছেই। আপনাদের পারিবারিক ব্যবসা পোশাক খাতে। আপনার মতে রপ্তানি খাতকে এগিয়ে নিতে কী করা দরকার?

শামস মাহমুদ: ভিয়েতনাম পোশাক খাতে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যদিও তাদের শ্রমিক বাংলাদেশের অর্ধেকের কম। ভিয়েতনাম কীভাবে ভালো করছে, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। বাংলাদেশ আর ভিয়েতনাম তো একই সময়ে শুরু করেছিল। ঢাকা চেম্বার আগে থেকেই বলছে, গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করলে সেখানে কর ছাড় দেওয়া উচিত। নগদ সহায়তার বদলে আমি গ্যাস-বিদ্যুতে ভর্তুকির পক্ষপাতী। নতুন বাজারগুলোতেও জোর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কূটনীতি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব হলো, সরকার আসিয়ানের (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০ দেশের জোট) পর্যবেক্ষক হওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে।

প্রথম আলো: রপ্তানি খাতের নেতিবাচক ধারা কি আগামী মাসগুলোতে অব্যাহত থাকবে?

শামস মাহমুদ: সেটা বলা কঠিন। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দায় আমরা দেখেছি, ক্রয়াদেশ বাড়ছে। কারণ, ক্রেতারা কম দামি পোশাক বেশি কিনেছিল। এবার মন্দা কিন্তু তখনকার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে যায়নি। যদিও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো আগের চেয়ে কম কিনছে। আমার মনে হয়, পোশাকের বাইরে এখন বস্ত্র খাতকে বড় সহায়তা দেওয়া উচিত। আমরা প্রস্তাব দেব, সম্ভাবনাময় সব খাতে পোশাক খাতের মতো ‘ব্যাক টু ব্যাক’ ঋণপত্র খোলা ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হোক।

প্রথম আলো: ডিসিসিআইতে নতুন সভাপতিরা নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন। আপনার পর্ষদের লক্ষ্য কী?

শামস মাহমুদ: আমরা এবার অবকাঠামো অর্থায়নের জন্য ন্যাশনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড মনিটরিং অ্যাডভাইজরি অথরিটি (নিডমা) গঠন করে নিডমা বন্ড ছাড়ার প্রস্তাব নিয়ে কাজ করব। আপনি জানেন, সরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। আমরা মনে করি, সরকার কার্যকর একটি বন্ড বাজার তৈরি করতে পারে, যেখানে সরকার তার প্রয়োজনীয় তহবিল বন্ডের মাধ্যমে ওঠাবে, তাহলে অনেক সুবিধা হবে। বন্ডে বিদেশি বিনিয়োগ হবে। নিডমা বন্ড চালু করলে সরকারও তুলনামূলক কম খরচে অবকাঠামোর তহবিল জোগাড় করতে পারবে। সরকার এখানে একটি শর্ত দিতে পারে যে পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত কোম্পানি অবণ্টিত মুনাফা থেকে নিডমা বন্ডে বিনিয়োগ করলে কিছু কর ছাড় পাবে, তাহলে এটি সফল হবে।

প্রথম আলো: নিডমা বন্ডের সুদের হার কত হতে পারে?

শামস মাহমুদ: ২ থেকে ৩ শতাংশও হতে পারে। বিদেশে তো ১ শতাংশ সুদে বিনিয়োগ হয়। আমরা নিডমা বন্ডকে তুলে ধরার জন্য দেশের বাইরে একটা রোড শো করব। ভোলা ব্রিজ ও হাইস্পিড রেলের পরিকল্পনা সামনে রেখে আমরা নিডমা বন্ডকে এগিয়ে নিতে চাই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0