খ্যাপাটে ষাঁড়ের মতোই ছুটছিল বৈশ্বিক পাম তেলের দাম। কোথায় থামবে দর—এমন দুশ্চিন্তা বাংলাদেশের মতো আমদানিকারক দেশগুলোর। বাঘা বাঘা বিশেষজ্ঞেরও আভাস ছিল, দাম বাড়বেই। দেরি না করে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরাও জানুয়ারিতে উদার হাতে ঋণপত্র খুলেছেন। গেল জানুয়ারির এই দৃশ্যপট পাল্টাতে খুব বেশি দিন লাগেনি। করোনাভাইরাসের প্রভাবে ফেব্রুয়ারিতে প্রথম ধাক্কা আসে বৈশ্বিক পাম তেলের বাজারে। মার্চের দ্বিতীয় দিন সোমবার জ্বালানি তেলের দাম ও দেশে দেশে পুঁজিবাজারে ধস নামলে ভালুকের মতো নেতিয়ে পড়তে থাকে পাম তেলের বাজারও। পাম তেলের পিছু পিছু সয়াবিন তেলেও উত্থান-পতন হচ্ছে।

ভোজ্যতেলের বাজারে পুঁজিবাজারের মতো ষাঁড়-ভালুকের খেলা চলছে এখন। ষাঁড়ের গতিতে ছুটে চলা দর হঠাৎ করে ভালুকের মতো ঝিমোচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবারের উত্থান-পতন ছাড়িয়ে গেছে ২০০৮ সালের উত্থান-পতনের ঘটনাকেও। ২০০৮ সালের উত্থান-পতনে ধরাশায়ী হয়ে পরবর্তী এক দশকে বাজার থেকে ছিটকে গেছে অনেকে। এবার দরপতন কোথায় ঠেকে, তা–ই এখনো নিশ্চিত নয়।

গেল বছরের নভেম্বর থেকেই পাম তেলের দাম বাড়তে থাকে বিশ্ববাজারে। পাম তেলের শীর্ষ উৎপাদনকারী দুই দেশ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় বায়োডিজেল তৈরিতে পাম তেলের ব্যবহার বাড়ানো এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার পূর্বাভাসে দাম বাড়তে থাকে। পাম তেলের মজুতও ছিল কম। বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে টনপ্রতি ২১৯ ডলার (কেজিপ্রতি প্রায় ১৯ টাকা) দাম বেড়ে যায় পাম তেলের। পাম তেলের উত্থানে সয়াবিনেরও দাম বাড়ে টনপ্রতি ১০৫ ডলার।

ভোজ্যতেলের এই ঊর্ধ্বগতি থামিয়ে দেয় করোনাভাইরাস। চীনে করোনাভাইরাসের প্রভাবে ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে দর হারাতে থাকে পাম ও সয়াবিন। এক মাসেই টনপ্রতি পাম তেলের দর কমে ৮১ ডলার। সয়াবিনের দর কমে ৭৫ ডলার। তবে সব কল্পনা ছাড়িয়ে ধস শুরু হয় মার্চে। কমতে কমতে গেল বৃহস্পতিবার পাম তেল এসে ঠেকেছে ৫৫৫ ডলারে। সয়াবিন এসে ঠেকেছে ৭৪০ ডলারে। দেড় মাসের ব্যবধানে পাম তেলে টনপ্রতি ২৫০ ডলার নেই। সয়াবিনে নেই ১২৫ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণপত্রের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভোজ্যতেলের উত্থান-পতনে দুই মাসের ব্যবধানে আমদানি করা তেলে দর হারিয়েছে প্রায় ৫ কোটি ডলার বা ৪৩৪ কোটি টাকা। এ সময় ৩৩ কোটি ৬৬ লাখ ডলারে প্রায় সাড়ে চার লাখ টন ভোজ্যতেলের ঋণপত্র খোলা হয়।

আবার আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের প্রভাব পড়তে সময় লাগেনি পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে। পাইকারি বাজারে পাম তেলের দাম মণপ্রতি কমে গেছে ৯০০ টাকা। কেজি হিসেবে ২৪ টাকা। সয়াবিন কমেছে মণপ্রতি ২০০ টাকা। ব্যবসায়ীরা ৮০০ ডলারের কম-বেশি দরে যেসব তেল এনেছেন, এখন তা বিক্রি করতে হবে এই বাজারদরে।

ভোজ্যতেল আমদানিতে শীর্ষ স্থানে আছে চট্টগ্রামের টি কে গ্রুপ। গ্রুপটির পরিচালক তারিক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ৮১০ ডলারে কেনা পাম তেল এখন বাজারজাত হচ্ছে। বাজারে আসার আগেই কেজিতে ২৪ টাকা কমে গেছে। বৈশ্বিক বাজারে এখন পুরোটাই আস্থাহীনতা। ২০০৮ সালেও এমন হয়নি। এ খাতের সবাই শঙ্কিত। কাল কী হবে, তা কেউ জানে না।

প্রধান দুটি ভোজ্যতেল সয়াবিন ও পাম কার্যত পুরোটাই আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, গত অর্থবছরে এ দুটো তেল আমদানি হয়েছিল ১৪ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, পরিমাণে তা ছিল ২৪ লাখ টন।

ভোজ্যতেলের এমন উত্থান-পতনে আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের মতো আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য স্বস্তি। দাম কমলে আমদানি ব্যয় কমবে। বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। ভোক্তারা কম দামে পাবে। সবই ঠিক আছে। তবে এই স্বস্তিতে উঁকি দিচ্ছে অস্বস্তিও। অস্বস্তির উদাহরণও আছে। ২০০৮ সালের ভোজ্যতেলের বাজারে উত্থান-পতনের সময়ও বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। সে সময় বাজারে ছিল অনেক প্রতিযোগী। ১১টি প্রতিষ্ঠান। তবে লোকসানের ধাক্কা সামাল দিতে না পেরে বাজার থেকে ছিটকে গেছেন অন্তত পাঁচজন। তাঁদের কাছে এখনো আটকা ব্যাংকের কয়েক হাজার কোটি টাকা। এখন ভোজ্যতেলের বাজারে সব মিলিয়ে আছে ছয়জন, যাঁদের হাতে ৯৬ শতাংশ বাজার।

রূপসা এডিবল অয়েল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ভোজ্যতেলের বাজারে উত্থান-পতন চলছে, তা পুঁজিবাজারের চেয়েও ভয়াবহ। অস্থির এই বাজারে কেউ থাকতে চাইবে না। এখন প্রতিযোগীর সংখ্যা কমে গেছে। যদি আরও কমে যায়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে ভোক্তার জন্যও সুফল বয়ে আনবে না।

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন