default-image

করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত দেশের অর্থনীতি। তাই ২ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ সুদের ঋণ তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়াতে নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন সুদহারও কমিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থনীতি চাঙা করতে নেওয়া এসব উদ্যোগেও সন্তুষ্ট হতে পারেনি সরকার। এখন আবারও রেপো সুদহার কমিয়ে আগ্রাসীভাবে বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৭ বছর পর কমানো হয়েছে ব্যাংক রেটও।

মন্দা মোকাবিলায় চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হলে মূল্যস্ফীতি ও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির আশঙ্কা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকই। এ জন্য ব্যাংকঋণ যাতে উৎপাদনশীল, কর্মসংস্থানমুখী ও পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানায় যায়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে বলছে সংস্থাটি।

প্রকাশিত মুদ্রানীতিকে ‘সম্প্রসারণমুখী ও সংকুলানমুখী’ বলছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এই মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে অর্থনীতিকে করোনা-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতি প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে গভর্নর ফজলে কবিরের একটি লিখিত বক্তব্যও দেওয়া হয়।

তবে নতুন মুদ্রানীতির ফলে ব্যাংকগুলো আগের চেয়ে কম সুদে টাকা ধার করতে পারবে। এতে ঋণের সুদহারও কমে এমনকি ৯ শতাংশের নিচেও নামতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ নিয়ে জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব উদ্যোগই নিয়েছে। এতে সুদহার আরও কমতে পারে। এখন ঋণের সঠিক ব্যবহার হলো কি না, সে জন্য তদারকি বাড়াতে হবে। আগামী সেপ্টেম্বরেই তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে ঋণের ব্যবহার নিয়ে নিরীক্ষা করাতে হবে। কারণ, এসব ঋণের যথাযথ ব্যবহার না হলে জমি, ফ্ল্যাটের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়তে পারে। এতে নতুন সমস্যা দেখা দেবে। খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে যাবে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, নতুন মুদ্রানীতিতে মোটা দাগে কয়েকটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধি যে হারে বাড়ছে, তা আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই সময় পর্যন্ত এর প্রবৃদ্ধি ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ রাখতে চায়, যা গত জুনে ছিল ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে আগামী বছরের জুনে তা কমিয়ে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। রিজার্ভ মানি হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দেওয়া অর্থ। সেটা ধার, পুনঃ অর্থায়ন, ডলার কিনে বা যেকোনো উপায়ে টাকা দেওয়া হতে পারে। সম্প্রতি রিজার্ভ মানি বেড়েছে ডলার কিনে টাকা দেওয়ায়, বিধিবদ্ধ জমা কমায় ও পুনঃ অর্থায়ন তহবিলের কারণে। গভর্নরও বলেছেন, করোনার কারণে ৫৫ হাজার ২৫০ কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন স্কিম চালু করা হয়েছে। ফলে মুদ্রাবাজারে পর্যাপ্ত তারল্য বজায় রয়েছে।

আর এই রিজার্ভ মানি বাজারে ঠিক কত গুণ হিসেবে কাজ করে, তাকে মানি মাল্টিপ্লায়ার বা টাকার সংখ্যাবৃদ্ধিকারক দিয়ে বোঝা যায়। গত জুনে মানি মাল্টিপ্লায়ার ছিল ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বরে তা ৫ দশমিক ১১ শতাংশ ও আগামী বছরের জুনে কমে ৪ দশমিক ৯৩ শতাংশে নিতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ জন্য বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি আগামী ডিসেম্বরে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ ও আগামী বছরের জুনে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশে তুলতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও গত জুনে অর্জন হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ব্যাংকে আমানতের প্রবাহ কমে যাওয়া, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও করোনার কারণে কয়েক মাস ধরে ব্যাংকঋণে মন্দাবস্থা বিরাজ করছে। কম সুদের কারণে বেসরকারি খাতের ঋণ কতটা বাড়বে, তা সময়ই বলে দেবে। যদিও গভর্নর এতেই স্বস্তির ঢেকুর তুলে বলেছেন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো উদীয়মান দেশের চেয়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি বেশি রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কম দেখালেও তাদের জন্য প্রক্ষেপিত ঋণের পরিমাণ বেশি।

এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ না বাড়লেও সরকার কিন্তু বসে নেই। গত জুনে সরকারি ঋণে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বরে তা অবশ্য ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ ও ২০২১ সালের জুনে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশে প্রাক্কলন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এদিকে প্রবাসী আয়ের কারণে বৈদেশিক সম্পদ বৃদ্ধির পূর্বাভাস মিললেও আগামী বছরের জুনে এই খাতে প্রবৃদ্ধি কমে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে, যা এখন ১০ দশমিক ২ শতাংশ। গভর্নরেরও আশঙ্কা, বৈশ্বিক মন্দার কারণে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় কমতে পারে।

নতুন মুদ্রানীতির লক্ষ্য অর্জনে নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন সুদহারে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যে টাকা ধার করে, তা ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ করা হয়েছে। একে রেপো বলা হয়। আর রিভার্স রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখে। এ ক্ষেত্রে সুদহার ৭৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ব্যাংক রেটে, যা ১০০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে পুনঃ অর্থায়ন তহবিলের সুদহার হবে ৪ শতাংশ। যদিও করোনার কারণে পুনঃ অর্থায়ন তহবিলের সুদ শূন্য শতাংশও করা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ কতটা কাজে আসবে, তা সময়সাপেক্ষ।

গভর্নর বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে করোনা-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে আনা মুদ্রানীতির লক্ষ্য।

লিখিত বক্তব্যে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতির লক্ষ্য অর্জনে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় দিক থেকেই কিছু ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।

অভিমত
default-image
লক্ষ্য আছে, সমাধান নেই
সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত মুদ্রানীতি সময়োপযোগী হয়নি। করোনা ও বন্যার কারণে অর্থনীতিতে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ এসেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুদ্রানীতিতে শুধু কিছু লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কীভাবে এসব লক্ষ্য অর্জিত হবে, তা মুদ্রানীতিতে নেই। কোনো সমাধানের কথা বলা হয়নি। এবারের বাজেট যেমন গতানুগতিক হয়েছে, তেমনি মুদ্রানীতিও গতানুগতিক। অতীতের মতো এই মুদ্রানীতিকে সম্প্রসারণশীল বলা হয়েছে। কিন্তু এই সম্প্রসারণশীল মুদ্রানীতি বাস্তবায়নের কোনো কর্মপরিকল্পনা নেই। মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে। ভোক্তা চাহিদাই তো নেই, মূল্যস্ফীতি হবে কীভাবে? আবার বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু কীভাবে হবে, তা বলা হয়নি। এখন ৮ শতাংশের মতো অর্জিত হয়েছে। কীভাবে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবাহ বাড়ানো হবে কিংবা ঋণপ্রবাহ বাড়ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের কোনো উদ্যোগের কথা মুদ্রানীতিতে বলা হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা নেই। ব্যাংকগুলো দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। ঋণের সরবরাহ বাড়াতে ব্যাংকগুলো কী করছে, এ নিয়ে এক মাস কিংবা তিন মাস পরপর পর্যবেক্ষণ করা উচিত। আবার সরকারি ঋণপ্রবাহে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জিত হবে, এতে লোকের আয় বাড়বে না। রেপো হার কমিয়ে তারল্য বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু ঋণের চাহিদায় তো নেই। শুধু টার্গেটনির্ভর গতানুগতিক এই মুদ্রানীতি দিয়ে বেশি দূর এগোনো যাবে না। মুদ্রানীতির লক্ষ্য অর্জনে বাস্তবতার ভিত্তিতে একটি কর্মপরিকল্পনা থাকা উচিত। মুদ্রানীতি এবার এক বছরের জন্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোভিড–১৯ ও বন্যার কারণে দ্রুত পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসছে। গতানুগতিক মুদ্রানীতি দিয়ে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে না। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মুদ্রানীতি দেওয়া হলেও ঘন ঘন প্রজ্ঞাপন দিয়ে নানা সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। আবার মুদ্রানীতিকে পাশ কাটিয়ে হোটেলে বসে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসবই যদি হয়, তাহলে এক বছরের জন্য মুদ্রানীতি দিয়ে কী লাভ? সার্বিকভাবে ঘোষিত মুদ্রানীতি নিয়ে আমি সন্তুষ্ট হতে পারছি না। মানুষ সমাধান চায়। বাস্তবভিত্তিক গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে মুদ্রানীতি দেওয়া উচিত।
default-image
যাদের ঋণ দরকার, তারা পাবে তো
আবুল কাসেম খান, সাবেক সভাপতি, ঢাকা চেম্বার
আমি অর্থনীতিবিদ না। তাই অর্থনীতির নিরিখে ঘোষিত মুদ্রানীতির মূল্যায়ন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমাদের চাওয়া, করোনার এ সময়ে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের দিকে বেশি নজর দিতে হবে। যেসব উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী ব্যাংক খাতের আওতায় নেই, তাদের কাছেও কম সুদের ঋণের সুবিধা পৌঁছে দিতে হবে। করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। এর মধ্যে বড় একটি অংশ আবার অনানুষ্ঠানিক খাতের সঙ্গে জড়িত। এটাই সুযোগ, প্রণোদনার আওতায় অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তাদেরও আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়ে আসার। বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে, সেখানে বাজারে টাকার জোগান বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। এর আগে আমরা দেখলাম করোনার ক্ষতি পোষাতে সরকার লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কত টাকার ঋণ বিতরণ হয়েছে? ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কত ঋণ পেয়েছে? কথা হচ্ছে, যতই ঋণের জোগান বাড়ানোর কথা বলা হোক, সেই ঋণ যদি যাদের প্রয়োজন তাদের হাতে দ্রুত ও সহজে না পৌঁছায়, তাহলে কোনো লাভ হবে না। ব্যাংকগুলো ১০০ কোটি টাকার ঋণ একজনকেও দিতে পারে, আবার ১০০ জনকেও ১ কোটি টাকা করে দিতে পারে। এর মধ্যে ব্যাংকের জন্য সহজ কাজ হচ্ছে, বড় একজন উদ্যোক্তাকে ধরে ১০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া। কিন্তু এখন সময় অধিক সংখ্যক উদ্যোক্তার হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়া। তা না হলে অনেক উদ্যোক্তা হারিয়ে যাবেন। আমার মনে হয়, নীতি বা প্রণোদনা ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। বর্তমান বাস্তবতায় আমার মনে হয়, ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে মাস ভিত্তিতে ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখতে হবে কোন খাতে কেমন ঋণ যাচ্ছে। বর্তমানে সব শ্রেণির উদ্যোক্তার কম সুদে ব্যাংকঋণ দরকার। করোনার ক্ষতি কাটিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে হলে অধিক সংখ্যক ব্যবসায়ীকে সহায়তা দিতে হবে।
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0