বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে গত কয়েক দশকের মধ্যে রেকর্ড মূল্যস্ফীতি হয়েছে। এ নিয়ে গত কয়েক মাসে লেখালেখিও কম হয়নি। মূলত কোভিড মহামারি শুরু হওয়ার পর দেশে দেশে যে লকডাউন দেওয়া হয়, তার জেরে সরবরাহ-ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে। এর মধ্যে উন্নত দেশগুলোর সরকার তাদের জনগণকে বিপুল প্রণোদনা দিয়েছে। এতে মানুষের হাতে খরচ করার মতো অনেক অর্থ জমে যায়। লকডাউন উঠে যাওয়ার পর মানুষ হুমড়ি খেয়ে কেনাকাটা শুরু করে। এতে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়।

সাধারণত মুদ্রা সরবরাহ হ্রাস করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতিতে লাগাম টানার চেষ্টা করে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ঠিক সে রকম নয়। নীতি সুদহার বৃদ্ধি করা হলে বাজারে চাহিদায় টান পড়বে—অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি রেকর্ড উচ্চতায় ওঠার পর উন্নয়নশীল দেশগুলো ইতিমধ্যে সুদহার বাড়াতে শুরু করেছে।

ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ মাসেই নীতি সুদহার ১ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। এ নিয়ে টানা তৃতীয়বার তারা সুদহার বৃদ্ধি করল। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড মহামারির মধ্যে দ্বিতীয়বার সুদহার বৃদ্ধি করতে যাচ্ছে। আর পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ইতিমধ্যে বলেছে, মার্চ মাসে তারা সুদহার বৃদ্ধি করবে। বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, এ বছর প্রতি প্রান্তিকেই ফেড দশমিক ২৫ শতাংশ সুদহার বৃদ্ধি করবে। সব মিলিয়ে ২০২২ সালে ফেড ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে সুদ বৃদ্ধি করতে পারে। দ্য ইকোনমিস্ট ধারণা করছে, ৫৮টি দেশে আগামী তিন বছর সুদহার বাড়বে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ইতিমধ্যে ১ শতাংশ বেড়েছে।

সম্প্রতি ব্যাংক অব কোরিয়া তিন মাসের মধ্যে এই প্রথম সুদহার বাড়িয়েছে। আর্থিক বাজারে নানা অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও এ পদক্ষেপে অটল আছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুরের মনিটরি অথরিটি টানা তৃতীয় বৈঠকে মুদ্রানীতি কঠোর করার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। এর এক দিন আগে রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউজিল্যান্ড টানা চতুর্থ বৈঠকে সুদের হার বাড়িয়েছে। ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে থাকা শ্রীলঙ্কা ৮ এপ্রিল সুদের হার বাড়িয়েছে।

ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক ইতিমধ্যে জানিয়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার নয়, তাদের প্রধান লক্ষ্য হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। টানা ১১ মাস নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে তারা। তবে পরের মুদ্রানীতিতেই যে নীতি সুদহার বাড়াতে হবে, সে বিষয়ে সংশয় নেই বিশ্লেষকদের। মূল্যস্ফীতির হার এমন বেলাগাম হলে ব্যাংকের হাতে উপায়ান্তরও থাকে না, বিশেষত যখন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রায় সব বড় দেশ বর্ধিত সুদের হারের পথে হাঁটছে। কিন্তু অর্থনীতি যখন সবে ঘুরে দাঁড়াতে আরম্ভ করেছিল, তখনই সুদের হার বাড়লে অর্থাৎ ঋণ পাওয়া কঠিন হলে বিনিয়োগে আবার ভাটা পড়বে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গেছে আর অর্থনীতিতে মন্দাভাব তৈরি হয়নি, এমন নজির কম। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশ থেকে নামাতে গিয়ে চাহিদায় টান পড়েনি, সর্বশেষ তেমন ঘটনা দেখা গেছে ৭০ বছর আগে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে অর্থনীতি গতি হারিয়ে ফেলবে। এ বাস্তবতায় নীতি সুদহার আবার কমে আসবে—সে রকম দিনের কথা কেবল আশাই করা যায়।

নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎস প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের এক নিবন্ধে লিখেছেন, এখন বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো গণহারে সুদহার বাড়ালে ব্যাপারটা ওভারডোজের মতো হবে। চাহিদা হ্রাস করে বা বেকারত্বের হার বাড়তে দিয়ে সরবরাহ-ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটানোর মানে হয় না। এই নীতি কিছুদিন চললে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে ঠিক, কিন্তু তাতে মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হবে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের।

সে জন্য স্টিগলিৎসের মত, সরবরাহ-ব্যবস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত ও রাজস্ব নীতি গ্রহণ করা। গরিবদের খাদ্যসহায়তার পাশাপাশি জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়া এবং মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করে কর হ্রাস করা। আর যেসব খাত মহামারিতে বড় দাও মেরেছে, তাদের কর বাড়িয়ে এই ভর্তুকির অর্থায়ন করা।

কোন দেশে কত মূল্যস্ফীতি

ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আর মার্চে মূল্যস্ফীতির হার ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। মূলত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে, যা ১৯৮১ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চ।

অন্যদিকে ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাজ্যের বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ। মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ শতাংশ, যা ১৯৯২ সালের পর সর্বোচ্চ।

সূত্র: বিবিসি ও সিএনএন

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন