default-image

বহুমাত্রিক অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত জীবন বীমা করপোরেশন (জেবিসি)। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটিতে আইন লঙ্ঘন করে দুই বছরে মোট ১৯৬ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ই হয়েছে ১৫৪ কোটি টাকা।

আইন অনুযায়ী লভ্যাংশের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বাধ্য জেবিসি। কিন্তু এই সংস্থা ২৩ কোটি টাকার লভ্যাংশ জমা দেয়নি। সংস্থাটি অনুমোদন ছাড়াই উৎসাহ বোনাস দিয়েছে, বকেয়া ভাড়া আদায় করেনি, বেতনকাঠামো লঙ্ঘন করে কর্মচারীদের মধ্যাহ্নভোজ ভাতা দিয়েছে। এ ছাড়া কয়েকজন কর্মচারী বিমা গ্রাহকদের প্রিমিয়ামের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে আরও ১৮ কোটি টাকা।

জেবিসির ২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরের ওপর সিএজি কার্যালয়ের তৈরি এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত সিএজির একটি দল জেবিসির প্রধান কার্যালয় এবং রংপুর, চট্টগ্রাম ও খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় পরিদর্শনসহ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী শিগগির এ প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে উপস্থাপন করবেন বলে জানা গেছে।

বর্তমানে প্রধান কার্যালয়ের পাশাপাশি জেবিসির ৮টি আঞ্চলিক, ১২টি করপোরেট, ৭৮টি সেলস এবং ৪৩৯টি শাখা কার্যালয় রয়েছে। তদন্ত দল ধারণা করছে, পুরো জেবিসির অনিয়ম বিবেচনায় নিলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি কয়েক গুণ বাড়বে।

যোগাযোগ করা হলেও জেবিসির এমডির চলতি দায়িত্বে থাকা মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আনোয়ার হোসেন এসব বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

বিজ্ঞাপন

অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়

আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, জেবিসি প্রথম বর্ষের প্রিমিয়াম আয়ের ৯০ শতাংশ ও নবায়নকৃত প্রিমিয়াম আয়ের ১২ শতাংশের বেশি ব্যবস্থাপনা ব্যয় করা যাবে না। বিদ্যমান বিমা আইনেও একই কথা বলা রয়েছে। কিন্তু জেবিসি আইনকানুনের ধার ধারেনি।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনমতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জেবিসির প্রথম বর্ষের প্রিমিয়াম আয় ছিল ১০৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, যার ৯০ শতাংশ ৯৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। একই সময়ে নবায়নকৃত প্রিমিয়াম আয় ছিল ৩৬০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, যার ১২ শতাংশ হলো ৪৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সে অনুযায়ী অনুমোদিত ব্যয় ১৪০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও সংস্থাটি ব্যয় করেছে ২২০ কোটি ৬২ লাখ টাকা। অর্থাৎ বেশি ব্যয় করেছে ৭৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। একইভাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরেও জেবিসি ৭৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বাড়তি ব্যয় করেছে। এ সম্পর্কে নিরীক্ষা দলকে জেবিসি বলেছে, ২০১৫ সালের জাতীয় বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের কারণে বাড়তি ব্যয় করতে হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

সিএজির নিরীক্ষা প্রতিবেদন

  • জেবিসির ৮টি আঞ্চলিক, ১২টি করপোরেট, ৭৮টি সেলস ও ৪৩৯টি শাখা আছে।

  • আইন লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় ১৫৪ কোটি টাকা।

  • এখতিয়ার নেই, তবু কর্মকর্তারা দুপুরের খাবার বিল নেন ৫ কোটি টাকা।

রাষ্ট্রীয় কোষাগারে লভ্যাংশ জমা হয়নি

ইনস্যুরেন্স করপোরেশন অ্যাক্ট, ১৯৭৩ অনুযায়ী জেবিসির লভ্যাংশের ৫ শতাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হওয়ার কথা। কিন্তু জেবিসি ২০০৯-১০ থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে ২২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা জমা দেয়নি। সংস্থাটির চার দফা দ্বিবার্ষিক মূল্যায়নেও এ তথ্য উঠে আসে।

লভ্যাংশ জমা না করে জেবিসি বরং ২০২০ সালের জানুয়ারিতে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর জন্য ২৫ কোটি টাকা অনুদান চেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ ব্যাপারে অর্থ বিভাগের অনুমোদন চেয়েও পায়নি। অর্থ বিভাগ বলেছে, লভ্যাংশের অংশ সরাসরি পরিশোধিত মূলধনে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ নেই।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, সংস্থাটিকে আগে লভ্যাংশের অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে হবে, তারপর পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

প্রিমিয়ামের অর্থ আত্মসাৎ

নিরীক্ষা প্রতিবেদনমতে, জেবিসির প্রধান কার্যালয় ও সিলেট আঞ্চলিক কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা দুই অর্থবছরে প্রিমিয়াম ও বিমাপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকদের ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর মধ্যে ১২ জন বিমা গ্রাহকের প্রিমিয়ামের ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা একাই আত্মসাৎ করেন অবসরপ্রাপ্ত উপব্যবস্থাপক বি কে বৈদ্য। এ ছাড়া উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. তাকভীর হোসেন ওরফে সবুজ ৭ লাখ ৮ হাজার, সিলেটের উপব্যবস্থাপক খন্দকার এ এইচ এম হাবিবুল্লাহ ২ লাখ ১৪ হাজার এবং আরেক উপব্যবস্থাপক সালেহ আহমেদ ১ লাখ ৭৭ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন।

জেবিসি গ্রাহকদের পাওনা টাকা পরিশোধ করলেও আত্মসাৎকারীদের কাছ থেকে ওই টাকা আদায় করতে পারেনি। তবে অর্থ আদায়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করেছে। জেবিসি কেবল খন্দকার এ এইচ এম হাবিবুল্লাহকে বরখাস্ত করার কথা জানিয়েছে নিরীক্ষা দলকে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় এবং যথাযথ তদারকির অভাবে একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে। আর মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে কতবার দুদকে যোগাযোগ করা হয়েছে, সে বিষয়ে জেবিসি কিছু বলতে পারেনি।

অনুমোদনহীন বোনাস

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে তাদের অনুমোদন ছাড়া বোনাস দিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। কিন্তু তা লঙ্ঘন করে জেবিসির কর্মকর্তারা দুই অর্থবছরে উৎসাহ বোনাস নিয়েছেন ৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

জেবিসি এ বিষয়ে নিরীক্ষা দলকে জবাব দিয়েছে যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নিষেধাজ্ঞাটি বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য, তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হচ্ছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। আর জেবিসির প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় এখন অর্থ মন্ত্রণালয় হলেও ২০০৮ সালের আগে ছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক আদেশ অনুযায়ীই জেবিসি বোনাস দিয়ে আসছে। তাই কর্মচারীদের মাসিক বেতন থেকে কিস্তির মাধ্যমে বোনাসের টাকা কেটে তা জেবিসির তহবিলে জমা করতে বলা হয়েছে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।

দুপুরের খাবারে ৫ কোটি টাকা

বিদ্যমান জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী একাদশ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরাই শুধু লাঞ্চ ভাতা পান। কিন্তু জেবিসির প্রথম থেকে দশম গ্রেডের কর্মকর্তারা দুই অর্থবছরে লাঞ্চ ভাতা নেন নিয়েছেন ৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

জেবিসি নিরীক্ষা দলকে জানিয়েছে, দুপুরের খাবার ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘কর্মচারী’ বলতে ‘কর্মকর্তা ও কর্মচারী’ উভয়কেই বোঝানো হয়। ভাতা প্রদানে সংস্থার পরিচালনা পর্ষদের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগেরও অনুমোদন রয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ ব্যয় বন্ধ এবং দুপুরের খাবারের ভাতা গ্রহণকারীদের কাছে টাকা আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও কিছু অনিয়ম

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেবিসি বাজেটের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যয় করেছে ৯৬ লাখ টাকা। আবার অগ্রিম নিয়েও ২২ লাখ টাকা সমন্বিত করে রাখা হয়েছে। সংস্থার সাবেক মহাব্যবস্থাপক দুলাল চন্দ্র নন্দী প্রিমিয়ামের টাকা আদায় করেও জেবিসির তহবিলে জমা দেননি ১৭ লাখ টাকা। জেবিসি ১০ বছরে আদায় করেছে মাত্র ১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা।

আইন খরচের ওপর ১৫ শতাংশ ও গাড়ি মেরামতের ওপর ১০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করের (মূসক) বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা ছাড়াই বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৮ লাখ টাকা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শর্ত লঙ্ঘন করে সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট আবু মো. শোয়াইব ও সহকারী সিস্টেম অ্যানালিস্ট মেহেদী হাসানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে নথি ও তথ্য চাইলে নিরীক্ষা দলকে তা না দিয়ে উল্টো অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন প্রশাসন ক্যাডার থেকে জেবিসিতে প্রেষণে আসা মহাব্যবস্থাপক সেখ কামাল হোসেন (উপসচিব)।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ভূমিকা

নিরীক্ষাকালীন চাহিদা অনুযায়ী তথ্য দেয়নি জেবিসি। দুই সিস্টেম অ্যানালিস্টের নথি চাইলে সেখ কামাল হোসেন নিরীক্ষা দলের সদস্য মহসীন আলীকে তা দেওয়া যাবে না বলে জানিয়ে দেন, অন্য কোনো শাখায় নথি চাইতে পারবেন না বলেও তাঁকে মৌখিক হুমকি দেন। এ তথ্য উল্লেখ করে কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলামকে গত ৩০ নভেম্বর চিঠি দেয় সিএজি কার্যালয়। সচিব ওই চিঠির জবাব দেননি।

এর আগে গত ১৬ নভেম্বর সংস্থাটিতে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের তথ্য জানিয়ে সচিব আসাদুল ইসলামকে আরেকটি চিঠি দেয় সিএজি কার্যালয়। পাঁচ সপ্তাহ সময় দেওয়া হলেও কোনো জবাব দেননি সচিব। জবাব না দেওয়ার কারণ জানতে চেয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে ১০ জানুয়ারি ও সর্বশেষ ২৪ জানুয়ারি আসাদুল ইসলামকে খুদে বার্তা দেওয়া হলেও কোনো জবাব দেননি তিনি।

এদিকে আপত্তিগুলো নিষ্পত্তির জন্য ২৫ জানুয়ারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে সিএজি কার্যালয়কে অনুরোধ করা হয় বলে জানা গেছে।

মন্তব্য করুন