default-image

খরা, অতিবন্যা ও করোনার কারণে দেশে কাঁচা পাটের ফলন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারতেও কাঁচা পাটের উৎপাদন ১৫-২০ শতাংশ কম হয়েছে। সে জন্য ভরা মৌসুমেও বাজারে পাটের মণ ২ হাজার ৭৫০ টাকা হয়ে গেছে, যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এখনই উদ্যোগ না নিলে হাজার কোটি টাকা দিয়েও জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে কাঁচা পাট পাওয়া যাবে না। সেটি হলে দেশীয় পাটকলগুলোর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে।

এমন যুক্তি দেখিয়ে অন্তত এক বছরের জন্য দেশ থেকে কাঁচা পাট রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবি জানিয়েছেন বেসরকারি পাটকলের মালিকেরা। কাঁচা পাটের ওপর টনপ্রতি ২৫০ মার্কিন ডলার রপ্তানি শুল্ক আরোপ করা এবং আনকাট, বাংলা তোষা রিজেকশন (বিটিআর) ও বাংলা হোয়াইট রিজেকশন (বিডব্লিউআর) পাট রপ্তানি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

দেশে বেসরকারি পাটকলের সংখ্যা ২৫৯। এতে কর্মরত আছেন দুই লাখ শ্রমিক-কর্মচারী। পাটকলগুলো বছরে ৬ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন পাটপণ্য রপ্তানি করে ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে।

রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে গতকাল বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে এ আহ্বান জানায় বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ) ও বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ)। এতে বক্তব্য দেন বিজেএমএর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পাটোয়ারি ও বিজেএসএর চেয়ারম্যান মো. জাহিদ মিয়া।

দুই সংগঠনের চেয়ারম্যান বলেন, দেশে বছরে সাধারণত গড়ে ৭৫ লাখ বেল কাঁচা পাট উৎপাদিত হয়। তবে খরা ও অতিবন্যার কারণে ধারণা করা যাচ্ছে, চলতি বছর উৎপাদিত হবে প্রায় ৫৫ লাখ বেল। অথচ পাটশিল্পের জন্যই প্রয়োজন হবে ৬০ লাখ বেল কাঁচা পাট। আর গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য ৫ লাখ বেল। কাঁচা পাটের অভাবে পাটকল বন্ধ হলে শ্রমিক-কর্মচারীরা চাকরি হারাবেন। এতে দেশের ব্যাংক, অর্থলগ্নি এবং বিমাপ্রতিষ্ঠানও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

বিজ্ঞাপন
ভারতে কাঁচা পাটের সংকট রয়েছে। তারা বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট কিনবে। তাই সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলে আমরা কাঁচা পাট পাব না।
মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পাটোয়ারি, চেয়ারম্যান, বিজেএমএ

কাঁচা পাটের উৎপাদন হ্রাসের তথ্যটি কতটুকু বাস্তবসম্মত? এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ পাটপণ্য রপ্তানিকারক সমিতির (বিজেপিই) চেয়ারম্যান এম সাজ্জাদ হোসাইন সোহেল বলেন, গত মৌসুমে ৮৪ লাখ বেল কাঁচা পাট উৎপাদিত হয়েছিল। এবার খরা ও করোনার কারণে কাঁচা পাটের উৎপাদন ১০ শতাংশ কম হয়েছে। আর বন্যার কারণে উৎপাদন কমেছে ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। তাতে উৎপাদন ৫৫ লাখ বেলের বেশি হবে না।

দেশে বেসরকারি পাটকলের সংখ্যা ২৫৯। এতে কর্মরত আছেন দুই লাখ শ্রমিক-কর্মচারী। পাটকলগুলো বছরে ৬ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন পাটপণ্য রপ্তানি করে ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে।

এক প্রশ্নের জবাবে বিজেএমএর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পাটোয়ারি বলেন, ‘ভারতে কাঁচা পাটের সংকট রয়েছে। তারা বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট কিনবে। তাই সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলে আমরা কাঁচা পাট পাব না।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পাটপণ্য তৈরিতে ৭৫ শতাংশ কাঁচামালই হচ্ছে কাঁচা পাট। তাই কাঁচা পাটের ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে পাটপণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। কাঁচা পাটের মূল্য অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেলে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। আর কাঁচা পাটের সরবরাহ ঘাটতির কারণে পাটকল বন্ধ হয়ে গেলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রেতারা পাটপণ্য ব্যবহার থেকে সরে দাঁড়াবেন।

বিজেএসএর চেয়ারম্যান জাহিদ মিয়া বলেন, ভারত বাংলাদেশি পাটপণ্যের ওপর অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করেছে। অথচ তারা কাঁচা পাটের ওপর শুল্ক আরোপ করেনি। পাটপণ্য উৎপাদনে উন্নত মানের কাঁচা পাট দরকার। তারা বাংলাদেশ থেকে উন্নত মানের কাঁচা পাট নিয়ে যায়।

চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ১৯ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে; যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি। এবারে কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ৯৭ লাখ ডলারের।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ১৯ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে; যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি। এবারে কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ৯৭ লাখ ডলারের।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা চেম্বারের পরিচালক মো. রাশেদুল করিম মুন্না, বিজেএসএর ভাইস চেয়ারম্যান ফারিয়ান ইউসুফ, পরিচালক নাজমুল হক প্রমুখ।

এদিকে চলতি মৌসুমে ব্যবসায়ীরা যাতে বেশি পরিমাণে পাট কিনে মজুত করে বাজারে সংকট সৃষ্টি করতে না পারেন, সে জন্য ব্যবস্থা নিতে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছে পাট অধিদপ্তর। সেই সঙ্গে কৃষকেরা যাতে পাটের উপযুক্ত মূল্য পান, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন বলে মনে করে অধিদপ্তর।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন