default-image

সোমবার দুপুর ১২টা। গদিতে বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন দেওয়ান ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপক হাবিবুর রহমান। জিজ্ঞেস করতেই জানালেন, তখন পর্যন্ত এক বস্তা ডালও বিক্রি করতে পারেননি। টানা অবরোধ-হরতালে দেড় মাস ধরেই এমন অবস্থা চলছে। কোনো কোনো দিন বউনি ছাড়াই খালি হাতে বাসায় ফেরার ঘটনাও ঘটেছে।
দেশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার রাজধানীর মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ীদের একটি প্রতীকী চিত্র এটি। আরও বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলেও প্রায় একই রকমের তথ্য জানা গেল। সবার এক কথা, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ঢাকার বাইরে থেকে পাইকারেরা আসতে পারছেন না। এমনকি ঢাকার ভেতরের বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ীরাও কম আসছেন। ফলে বেচাবিক্রি আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে।
মৌলভীবাজার মসলা, ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, আটা, ময়দাসহ বিভিন্ন পণ্যের বড় পাইকারি বাজার। এখানে ১০ হাজারের মতো ছোট-বড় দোকান আছে। ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে পাইকারেরা এখানে আসেন। স্বাভাবিক সময়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পণ্য ওঠানো-নামানো ও পরিবহন এবং ক্রেতাদের আনাগোনায় জমজমাট থাকে এই বাজার। তবে এখন উল্টো চিত্র।
হরতালের মধ্যে রিকশায় করে গতকাল সোমবার কোনো রকম যানজট ছাড়াই বংশাল থেকে মাত্র মিনিট বিশেকের মধ্যে মৌলভীবাজারে পৌঁছানো গেল। অবশ্য অন্য সময় কোনোভাবেই এক থেকে দেড় ঘণ্টার কমে যাওয়ার উপায় নেই। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নেমেই পুরো এক চক্কর দিয়ে দেখা গেল, মৌলভীবাজারে গিঞ্জি অলিগলিতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ভিড়বাট্টা তুলনামূলক কম। হাতে গোনা দু-চারটি দোকানে ক্রেতার দেখা মিললেও অধিকাংশ দোকানের সামনে খরিদ্দারদের জন্য রাখা ছোট ছোট টুলগুলো ফাঁকা। ক্রেতার আশায় বসে আছেন দোকানিরা। কেউ কেউ আবার মুঠোফোনে কথা বলে কিংবা আড্ডা দিয়ে অলস সময় পার করছেন।
দেওয়ান ট্রেডার্সের হাবিবুর রহমান আরও জানান, অবরোধ শুরু হওয়ার পর প্রথমে ডালের দাম কেজিতে দু-তিন টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই আবার দাম পড়ে যায়। কারণ, ক্রেতা কম, চাহিদা নেই। গতকাল নেপালি মসুর ডাল ১০৮ ও দেশি মসুর ডাল ১০৫-১০৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা যায়। এ ছাড়া মুগডালের দাম জাতভেদে ৬০ থেকে ১১০ টাকা ও মটর ডাল ৪২ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পণ্য কীভাবে আনেন—জানতে চাইলে হাবিবুর রহমান বলেন, ‘শুক্র ও শনিবারে কিছু কিছু করে আনি। তা দিয়েই সারা সপ্তাহ চলে।’ তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে ১০০ থেকে ১৫০ বস্তা ডাল বিক্রি হয়। আর এখন দিনে ১০-২০ বস্তাও হয় না। ক্রেতা নেই। কেই বা আসবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।’
এই দোকানের কাজ করেন সর্দার মো. বাবুল। পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ করা শ্রমিকদের এখানে সর্দার বলা হয়। প্রতি বস্তায় তিন থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত পান তাঁরা। বাবুল আমাদের আলাপচারিতা মন দিয়ে শুনছিলেন। হঠাৎ আক্ষেপ করে বললেন, ‘সকাল থেকে এখন পর্যন্ত একটি বস্তাও মাথায় তুলতে পারিনি।’
দোকানটি থেকে বেরিয়ে হাঁটা দিতেই চোখে পড়ল ইমরুজ এন্টারপ্রাইজ। দোকানের শাটারের এক পাশ নামানো। ভেতরে বসে আছেন ব্যবস্থাপক বি আর সাহা। ৩৭ বছর ধরে এখানেই কাজ করেন তিনি। বললেন, ‘বিক্রির অবস্থা এতটাই খারাপ যে লাভ ছাড়াই ভোজ্যতেল বিক্রির চেষ্টা করছি। যাতে লেনদেনটা অন্তত হয়।’ তাঁর দাবি, ‘১৬ লিটারের টিনজাত সয়াবিন তেলের মিলগেটে দাম ১ হাজার ৪৪৪ টাকা। এর সঙ্গে পরিবহনসহ অন্য খরচ যোগ করলে ১ হাজার ৬২০ টাকা দাঁড়ায়। অথচ আমরা এখন ১২০ টাকা লোকসান দিয়ে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি করার চেষ্টা করছি।’
বাজারে পর্যাপ্ত ভোগ্যপণ্য মজুত আছে কি না—জানতে চাইলে বি আর সাহা বলেন, ‘চাহিদা ও জোগান দুটিই কম। ব্যবসায়ীরা এক গাড়ি মালে পাঁচ হাজার টাকা মুনাফা করার আশায় এক লাখ টাকার ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। কেউ তো বলতে পারছে না, পথে কখন কে সর্বনাশ করে দেয়।’ তিনি জানান, আগে সারা দিন ৫০০ টিন তেল বিক্রি করলেও এখন তা কমে ২০-৩০টিতে নেমে এসেছে।
জানতে চাইলে মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে দিনে এই বাজারে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। টানা অবরোধ-হরতালে বেচাকেনা চার ভাগের এক ভাগে নেমে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘এখানকার ব্যবসায়ীদের অধিকাংশই কোটি কোটি টাকা ব্যাংকঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন। বেচাকেনা না থাকায় তাঁরা এখন বিপাকে পড়েছেন, কীভাবে এই ঋণ সুদ করবেন। ব্যাংক তো আর এসব বুঝবে না।’
আবদুর রাজ্জাক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা না বাঁচলে দেশ বাঁচবে কীভাবে। রাজনীতিকেরা কি সেটি বোঝেন না?’

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন