>সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ২০১৮ সালে ৩৯২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের ৪ ভাগের ১ ভাগ।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন চার ব্যাংক সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালীর মুনাফায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। ২০১৮ সালে ব্যাংক চারটির সম্মিলিত নিট মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৯২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ৪ ভাগের ১ ভাগ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে মুনাফা কমে যাওয়ার এ চিত্র উঠে আসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর সমঝোতা চুক্তি রয়েছে। সে অনুযায়ী তাদের চলতে হয়। গত সপ্তাহে এ নিয়ে ব্যাংক চারটির সঙ্গে সভাও করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

মুনাফা কমে যাওয়ার কারণ, ব্যাংকগুলোতে বড় গ্রাহকদের অনেকে খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল করেও কিস্তি পরিশোধ করছেন না। ফলে খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে আয় থেকে বিপুল অর্থ সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে হচ্ছে। এ ছাড়া এ চার ব্যাংক গ্রাহকদের যে ঋণপত্র, নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টির মতো ‘নন ফান্ডেড’ (নগদ টাকার বাইরে দেওয়ার নিশ্চয়তা) সুবিধা দিয়েছিল, তার একাংশও খেলাপি হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে সোনালী ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ৭০৯ কোটি টাকা, যা ২০১৮ সালে দাঁড়িয়েছে ২২৬ কোটি টাকায়। একইভাবে জনতা ব্যাংকের নিট মুনাফা ২৬৮ কোটি টাকা থেকে কমে হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের মুনাফায়ও বড় ধস নেমেছে। ২০১৭ সালের ৬৭৬ কোটি টাকার মুনাফা থেকে গত বছর তা কমে ১০৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অবশ্য বাকি ব্যাংকগুলোর তুলনায় রূপালীর মুনাফা কম হারে কমেছে, ৫০ কোটি টাকা থেকে নেমেছে ৩৮ কোটি টাকায়। এ মুনাফা দেখাতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে সঞ্চিতি রাখার ক্ষেত্রে ছাড় নিয়েছে ব্যাংকগুলো।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবছর সরকারি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তির যেসব শর্ত থাকে, সে অনুযায়ী সব ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। এবারও তাই হয়েছে।

আটকে গেছে টাকা

রাষ্ট্রমালিকানাধীন চার ব্যাংক বেশ কিছু বড় গ্রাহককে ঋণ দিয়ে আটকা পড়েছে। এসব ঋণ সহজে আদায় করা যাচ্ছে না। খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণ পুনঃ তফসিল করার পর কিস্তি না দেওয়ায় ওই সব গ্রাহকের বড় অংশের নাম খেলাপির তালিকায় উঠছে।

ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে চার ব্যাংক মিলে ৪৩২ জন গ্রাহকের ঋণ পুনঃ তফসিল করেছিল। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ না করায় বছর শেষে আবার খেলাপি হয়ে পড়েন ২১৭ জন গ্রাহক। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ কিনে আটকে গেছে অগ্রণী ও জনতা ব্যাংক। এসব ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। টাকা আদায়ে তারা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। এরপরও অন্য ব্যাংক থেকে কেনা ঋণের টাকা আদায় করতে পারছে না ব্যাংক দুটি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সোনালী ব্যাংক ৭৩ জন গ্রাহকের ৩ হাজার ৮৬০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃ তফসিল করে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৫১ কোটি টাকার কিস্তি পরিশোধ হয়নি। ফলে ৩৫ জন গ্রাহক আবার খেলাপি হয়ে গেছে। আলোচ্য সময়ে জনতা ব্যাংক ১২৬ জন গ্রাহকের ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃ তফসিল করে। এর মধ্যে পুনঃ তফসিল সুবিধা পাওয়া গ্রাহকেরা ২ হাজার ২৬৩ কোটি টাকার কিস্তি পরিশোধ করেননি। আবারও খেলাপি হয়ে পড়েছেন ৭৩ জন গ্রাহক।

অগ্রণী ব্যাংক ১৬৬ গ্রাহকের ৫ হাজার ১৩৯ কোটি টাকার ঋণ পুনঃ তফসিল করেছিল। এর মধ্যে ৭৩৪ কোটি টাকার কিস্তি অপরিশোধিত রয়ে গেছে। ফলে আবারও খেলাপি হয়েছেন ৬৩ জন গ্রাহক। রূপালী ব্যাংক ৬৭ জন গ্রাহকের ৫ হাজার ১৩৯ কোটি টাকার ঋণ পুনঃ তফসিল করে। ৬৭৩ কোটি টাকার কিস্তি পরিশোধ না করায় ৪৬ জন গ্রাহক আবারও খেলাপি হয়ে পড়েছেন।

সোনালী ব্যাংকের পুনঃ তফসিল করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪৮ কোটি টাকা, জনতার ১০ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা, অগ্রণীর ৫ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা ও রূপালীর ২ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা।

রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান প্রধান বলেন, রূপালী ব্যাংক গত বছর ‘কোর ব্যাংকিং সিস্টেমের’ শর্তগুলো শতভাগ বাস্তবায়ন করেছে। ফলে ডিসেম্বর মাসে অনেক সূচক খারাপ দেখালেও জানুয়ারিতে আবার এসব সূচক ভালো হয়ে গেছে।

নিশ্চয়তাও খেলাপি

এদিকে ২০১৮ সাল শেষে সোনালী ব্যাংকের নন-ফান্ডেড ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা ফান্ডেড দায়ে পরিণত হয়েছে। আর এসব ঋণের মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৭৮৪ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের নন-ফান্ডেড ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। আর এসব দায় ফান্ডেড ঋণে পরিণত হয়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ২ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা।

অগ্রণী ব্যাংকের নন-ফান্ডেড ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফান্ডেড হয়ে পড়েছে ২৮৫ কোটি টাকা এবং খেলাপি হয়ে গেছে ১৭১ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের নন-ফান্ডেড দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা, এর মধ্যে ফান্ডেড হয়ে গেছে ৫৭৮ কোটি টাকা। আর খেলাপি হয়ে গেছে ২০৯ কোটি টাকা।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস-উল-ইসলাম বলেন, ‘আমার মেয়াদে একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ অধিগ্রহণ করা হয়। এটি খুব ভালো চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ অধিগ্রহণের যে তথ্য তুলে ধরেছে, সেটা অনেক আগের।’ তিনি বলেন, ‘নন-ফান্ডেড ঋণ যাতে খেলাপিতে পরিণত না হয়, এ নিয়ে আমরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছি।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0