default-image

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির চার বছর হয়ে গেল। অথচ এখনো চুরি হওয়া অর্থের ৫৬১ কোটি টাকা এখনো ফেরত আসেনি। সেই অর্থ ফেরত আসার কোনো আশ্বাসও মেলেনি। রিজার্ভ চুরি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনে যে মামলা চলছে, তাতেও এখন আর অর্থ ফেরত পাওয়ার কোনো আশা দেখা যাচ্ছে না।

নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ বা নিউইয়র্ক ফেডে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি হয় ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ফেরত আসে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এখনো রয়ে গেছে ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার বা ৫৬১ কোটি টাকা।

রিজার্ভ চুরির পর যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে ২০১৯ সালের শুরুতে মামলা দায়ের করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই আদালতে সব পক্ষ প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়েছে। এখন সেই আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলাটি চলবে কি না, শিগগিরই তার রায় দেবেন মার্কিন আদালত। ফলে টাকা উদ্ধার নয়, আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলা চালানোর চেষ্টাই চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সূত্র জানায়, রিজার্ভ চুরির ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলারের মধ্যে ৫ কোটি ২০ লাখ ডলার নিয়ে ফিলিপাইনের আদালতে কমপক্ষে ১২টি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ জব্দও করে রেখেছেন দেশটির আদালত। তবে এসব মামলার অগ্রগতি খুবই মন্থর। ফলে ফিলিপাইনের মামলার মাধ্যমে টাকা আদায়ের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আর ঘটনার তিন বছর পর ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে মামলা করে বাংলাদেশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে করা মামলায় ফিলিপাইনের পাঁচটি আর্থিক ও ক্যাসিনো প্রতিষ্ঠান, দেশটির ১২ জন, ৩ জন চীনা নাগরিকসহ মোট ২০ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয়।

বাংলাদেশের করা মামলায় পাঁচ আসামি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি), ম্যানিলার ব্যবসায়িক সংগঠন ফিলরেম সার্ভিস করপোরেশন, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সেঞ্চুরিটেক্স ট্রেডিং, ক্যাসিনো প্রতিষ্ঠান ব্লুমবেরি রিসোর্ট অ্যান্ড হোটেলসের সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনো এবং দেশটির আরেক ক্যাসিনো প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন হাওয়াই লেইজার কোম্পানি লিমিটেডের মাইডাস হোটেল অ্যান্ড ক্যাসিনো।

>

চুরি যাওয়া অর্থের মধ্যে ৫৬১ কোটি টাকা এখনো ফেরেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনে যে মামলা চলছে, তাতে অর্থ ফেরত পাওয়ার আশা ক্ষীণ।

ফিলিপিনো আসামিদের আটজন রিজার্ভ চুরির সময়ে আরসিবিসির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁরা হলেন আরসিবিসির জুপিটার শাখার তৎকালীন ব্যবস্থাপক মায়া দেগুইতো ও কাস্টমার সার্ভিসের প্রধান রোমুলডো এস অ্যাগ্রাডো, সিনিয়র কাস্টমার রিলেশনস অফিসার অ্যাঞ্জেলা রুথ টরেস এবং ব্যাংকটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও সিইও লরেনজো ভি ট্যান, রিটেইল ব্যাংকিং গ্রুপের প্রধান রাউল ভিক্টোর বি ট্যান, রিটেইল ব্যাংকিং গ্রুপের ন্যাশনাল সেলস ডিরেক্টর ইজমায়েল এস রেয়েস, রিটেইল ব্যাংকিং গ্রুপের রিজিওনাল সেলস ডিরেক্টর ব্রিজিট আর ক্যাপিনা ও ডিস্ট্রিক্ট সেলস ডিরেক্টর নেস্টর ও পিনেডা।

রিজাল ব্যাংক অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়ের করা মামলাকে একটি রাজনৈতিক চালবাজি বলে পরদিনই বিবৃতি দেয়। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে করা মামলা সেখানে চলবে কি না, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে মামলা চলবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। আগামী মার্চের মধ্যে এ নিয়ে রায় দেবেন দেশটির আদালত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা এ নিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা না চালানোর রায় এলে আবার আপিল করা হবে। কারণ, এই মামলা অন্য দেশে গেলে ফিলিপাইনের সঙ্গে টেকা যাবে না। বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রই নিরাপদ।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘টাকা ফেরত পাওয়ার আশাতেই আমরা যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা করেছি। টাকা ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে এখনো আশাবাদী।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় পদত্যাগ করতে হয় তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানকে। তিনি প্রায় ২৪ দিন এই ঘটনা গোপন রেখেছিলেন। এরপর দুই ডেপুটি গভর্নরকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া বদলি করা হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে।

রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের যুগ্ম পরিচালক জুবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। তবে রিজার্ভ চুরির মামলায় বাংলাদেশ অংশের তদন্ত শেষ হলেও শিগগিরই চার্জশিট দিতে পারছে না পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0