শিল্পের নতুন করিডর

কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে টানেল তৈরির উদ্যোগের পর দক্ষিণ চট্টগ্রামে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন উদ্যোক্তারা। কক্সবাজার থেকে মিরসরাই পর্যন্ত সাগর উপকূল ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়ছে।

এক দশক আগেও কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পারে ছিল হাতে গোনা কিছু কারখানা। শাহ আমানত সেতু নির্মাণের পর এ সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। কাছাকাছি বন্দরসুবিধা থাকার পরও সহজ যোগাযোগের অভাবে এ এলাকায় শিল্পকারখানার তেমন প্রসার হয়নি। তবে নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়ার পর থেকে নতুন নতুন কারখানা স্থাপিত হচ্ছে। আবার পুরোনো কারখানাও সম্প্রসারিত হচ্ছে। আবার অনেক উদ্যোক্তা কারখানা গড়ে তোলার চিন্তা থেকে আগাম জমি কিনে রেখেছেন। সব মিলিয়ে কর্ণফুলী টানেলকে ঘিরে নতুন নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের এক ব্যাপক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, টানেল চালু হলে শুধু আনোয়ারা বা কর্ণফুলীই নয়, মিরসরাই থেকে নদীর পার ধরে কক্সবাজার পর্যন্ত বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হবে। চট্টগ্রাম শহর এড়িয়ে যোগাযোগসুবিধার কারণে শিল্পকারখানার কাঁচামাল যেমন সহজে আনা-নেওয়া করা যাবে, তেমনি প্রস্তুত পণ্যও সারা দেশে খুব সহজে নেওয়া যাবে টানেল ব্যবহার করে।

তবে উদ্যোক্তারা এও মনে করেন, টানেলের সুফল পেতে হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামে সড়কসুবিধা আরও বাড়াতে হবে। সে জন্য সরকার মিরসরাই থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণের যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলে শুধু শিল্পকারখানাই নয়, মিরসরাই থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রাম কিংবা কক্সবাজার পর্যন্ত সাগরপার ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হবে। পর্যটন খাতও বিকশিত হবে।

অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু টানেল চালু হলে শুরুতে কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড় আনোয়ারাসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পায়ন হবে। তবে মিরসরাই থেকে টানেল হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ হলে বহুবিস্তৃত উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে। মেরিন ড্রাইভের সঙ্গে বাস্তবায়নাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, চট্টগ্রাম বন্দর, প্রস্তাবিত বে টার্মিনাল ও মিরসরাইয়ের প্রস্তাবিত বন্দর যুক্ত হয়ে সহজ যোগাযোগ গড়ে উঠবে। এতে মিরসরাই থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সাগর উপকূল ধরে মেরিন ড্রাইভের আশপাশের দীর্ঘ এলাকা দেশের সর্ববৃহৎ শিল্প করিডরে রূপ নেবে।’

কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম শহরকে আলাদা করেছে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকে। নদীর ডান তীরে শহর ও বন্দরের অবস্থান। বাঁ তীরে দক্ষিণ চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার। নদীর উজানে জরাজীর্ণ কালুরঘাট সেতু দিয়ে ভারী যানবাহন চলতে পারে না। ২০১০ সালে শাহ আমানত তৃতীয় সেতু নির্মাণ করা হলেও যান চলাচল বেশি। আবার শহরের মধ্য দিয়ে আসা-যাওয়া করতে হয়। তাতে পণ্যবাহী যান চলাচলে সময় লাগে বেশি। কার্যত একটি সেতু পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রাম কিংবা কক্সবাজার অঞ্চলের শিল্পকারখানার পণ্য পরিবহনের চাপ সামলাতে পারছে না।

এরপরও কর্ণফুলী নদীর সুবিধা কাজে লাগিয়ে নদীর বাঁ তীরে সার কারখানা, সিমেন্ট ও চিনি পরিশোধন কারখানা গড়ে উঠেছে। ২০১০ সালে শাহ আমানত তৃতীয় সেতু নির্মাণের পর দক্ষিণ পারে কারখানার সংখ্যা বাড়তে থাকে। তবে নদীর বাঁ তীরসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামে প্রত্যাশা অনুযায়ী শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। এখন কর্ণফুলী টানেল শিল্পকারখানা প্রসারের সুযোগ করে দিয়েছে।

টানেলকে কেন্দ্র করে এ বছর প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নদীর বাঁ তীরে কর্ণফুলী উপজেলার জুলধা এলাকায় একটি ইস্পাত কারখানা চালু করেছে মোস্তফা হাকিম গ্রুপ। সেখানে দেড় হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রিমিয়ার সিমেন্ট সম্প্রসারণ করেছে তাদের কারখানা। টানেলের সংযোগ সড়কের মাঝখানে গড়ে তোলা হচ্ছে এইচ এস কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড নামের নতুন কারখানা। টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়ার পর খাদ্য, ফিশারিজ, টেক্সটাইল খাতের বেশ কিছু কারখানা গড়ে উঠেছে।

আনোয়ারা ও মহেশখালীতে অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে। সেখানকার কারখানার পণ্যও টানেল দিয়ে সহজে আনা-নেওয়া করা যাবে। নতুন কারখানা ছাড়াও যেসব কারখানা আগে চালু হয়েছে, সেগুলোও এখন বাড়তি সুবিধা পাবে। কোরিয়ান ইপিজেডের কারখানার কাঁচামাল বন্দর দিয়ে খালাস করে টানেল হয়ে আনা-নেওয়া করা যাবে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, শিল্পকারখানার জন্য সহজ যোগাযোগ হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারখানার কাঁচামাল আনা-নেওয়া এবং প্রস্তুত পণ্য সারা দেশে পরিবহনের সহজ মাধ্যম হবে এই টানেল। দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে এখন নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠতে কোনো বাধা থাকবে না। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের টার্মিনাল ও চট্টগ্রাম বন্দর—এই দুই বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে সহজ যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে টানেলটি।

২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। টানেলের সমীক্ষা হয় ২০১৩ সালে। এরপর নানা ধাপ পেরিয়ে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে টানেলের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

সরকার জাপানের সহায়তায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে সমন্বিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডবিষয়ক ‘বিগ-বি’ ধারণা বাস্তবায়ন করছে। বিগ বি হলো দ্য বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট, যা এ অঞ্চলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বন্দর, যোগাযোগ, শিল্পাঞ্চলসহ সমন্বিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের উদ্যোগ। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে বিগ বি উদ্যোগের ঘোষণা দেন। এখন দেখা যাচ্ছে, টানেল মূলত বিগ বির সমন্বিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের যোগাযোগের নতুন সুবিধার সংযোগ তৈরি করতে যাচ্ছে। যার এক পাশে আছে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার আর আরেক পাশে চট্টগ্রাম ও ঢাকা।

টানেলের আরেকটি সুবিধা হলো মাতারবাড়ীতে সারা দেশের সঙ্গে নৌপথের পাশাপাশি স্থলপথে সহজ যোগাযোগসুবিধা। অবশ্য এর পুরো সুফল পেতে হলে মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে নৌপথের পাশাপাশি সড়কপথে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত পণ্য আনা-নেওয়া করা যাবে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, পদ্মা সেতু হলে যেমন দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জোয়ার শুরু হবে, তেমনি কর্ণফুলী টানেল দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনবে। গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে টানেল সংযুক্ত হয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারকে শিল্প ও ব্যবসা–বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করবে।