শীর্ষ হাজার গ্রাহকের ২৫ শতাংশই খেলাপি

বাংলাদেশে ব্যাংকঋণের ৩০ শতাংশই বড় গ্রাহকদের নিয়ন্ত্রণে। আবার শীর্ষ ১ হাজার গ্রাহকের মধ্যে ২৫ শতাংশই খেলাপি। এ ছাড়া গত পাঁচ বছরে খেলাপি ঋণের ৩৮ শতাংশই অবলোপন করেছে ব্যাংকগুলোকে। খেলাপি ঋণ বাড়ার অন্যতম কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরকারি ব্যাংকগুলোতে ঋণ জালিয়াতি, বড় গ্রুপগুলোকে অতিরিক্ত অর্থায়ন, অযোগ্য ঋণগ্রহীতা বাছাই, অপর্যাপ্ত তদারকি ও ফলোআপ।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে ২০১৫ সালের ব্যাংক খাতের এসব তথ্য তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী। প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে গতকাল রোববার দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।
উদ্বোধনী বক্তৃতায় ফজলে কবির বলেন, বাংলাদেশে ব্যাংক খাতের জন্য নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ এসেছে। তা মোকাবিলা করতে ব্যাংকগুলোকে উদ্যোগ নিতে হবে।
তৌফিক চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংকসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বড় গ্রুপগুলোর কাছে বেশি ঋণ থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। বড় গ্রুপগুলোর কাছে আটকে থাকা অর্থের কারণে আর্থিক খাতে ধস নামতে পারে।
তৌফিক চৌধুরী বলেন, এখনো বেসরকারি খাত বিদেশি ঋণ নিতে আগ্রহী। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রা থেকে ঋণের ব্যবস্থা করতে পারে। ব্যাংকগুলোর তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা পরীক্ষা করতে বাংলাদেশ ব্যাংকগুলোকে নৈতিক হ্যাকারদের কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি।
ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়া এখনো ব্যাংক খাতের জন্য সমস্যা উল্লেখ করে তৌফিক চৌধুরী বলেন, ৩৭ শতাংশ ব্যবসা খাতে, ৫৫ শতাংশ ঋণ বড় গ্রুপগুলোর কাছে গেছে। ৯০ শতাংশ ঋণ শহরে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে।
উদ্বোধনের পর সামষ্টিক আর্থিক অবস্থা নিয়ে এক অধিবেশনে ছয়টি নিবন্ধ উপস্থাপিত হয়। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম। এতে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয়তা শীর্ষক নিবন্ধে বলা হয়, কার্যক্রমে থাকা ব্যাংকগুলোয় পর্যাপ্ত তহবিল রয়েছে, গ্রাহকদের চাহিদাও পূরণ করতে পারছে। গ্রাহকেরা ব্যাংকগুলো থেকে চাহিদা অনুযায়ী ঋণও পাচ্ছেন। ফলে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার কোনো প্রয়োজন নেই।
আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ইয়াসীন আলী বলেন, ১০ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে পড়লে কোনো ব্যাংকের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন। ব্যাংকটির পক্ষে সুদের হার কমানোও কষ্টসাধ্য। ব্যাংক থেকে টাকা নিলে পরিশোধ করতে হয়, গ্রাহকদের মধ্যে এ সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। ভারতে খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ, নতুন ব্যবসায় বাধা সৃষ্টিসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে ব্যাংক খাতকে রক্ষা করা যেতে পারে।
ইয়াসীন আলীর মতে, ৫-৬টি ব্যাংক থেকে ১৫-২০ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছে কয়েকটি গ্রুপ। যা পরিশোধ না হলে ব্যাংকগুলো ধসে পড়বে। পুরো খাতে এর প্রভাব পড়বে। মোট দেশজ উৎপাদন ২-৩ শতাংশ কমে যাবে।
ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী বলেন, ব্যাংকগুলোকে স্বল্পমেয়াদি মুনাফার দিকে না ঝুঁকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। দু-একজন গ্রাহকের পেছনে সবাই না ছুটে নতুন গ্রাহক খুঁজতে হবে। ব্যাংকগুলোকে পরিবেশ রক্ষায় কাজ করতে হবে।
আরফান আলী বলেন, ঋণের ৭০ শতাংশ এখনো ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটা কমাতে হবে। ব্যাংকগুলোকে নতুন নতুন এলাকায় ঋণ ছড়িয়ে দিতে হবে।