প্রতিবারই প্রাক্–বাজেট আলোচনায় সবাই শুধু কর ছাড় চান। কেউ কর আহরণের সৃজনশীল খাতের কথা বলেন না। আবার অর্থমন্ত্রীকে কর ছাড় চাওয়া ওই ব্যবসায়ী শ্রেণিকেও খুশি করতে হয়। এর ফলে শুল্ক-কর আদায়ের জায়গা সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়

২০১৬ সালের মে মাসে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের উপস্থিতিতে এক সভায় একটি অনুশাসন দেন। অনুশাসনটি এমন, কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন কিংবা মেরামত, সংরক্ষণ বা পরিচালনায় বিভিন্ন পণ্য বা সেবায় বা বিভিন্ন রসদ-উপাদান কেনার সময় কোনো শুল্ক-কর রেয়াতের জন্য আবেদন করা যাবে না। এর পরিবর্তে ওই সব পণ্য বা সেবা আমদানি ও কেনাকাটার বিপরীতে আয়কর, ভ্যাট, আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক যত হয়, তা হিসাব করে প্রয়োজনীয় অর্থ বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শুল্ক-করের সেই অর্থ বাজেট বরাদ্দ থেকে পরিশোধ করতে হবে। অর্থমন্ত্রীর অনুশাসন অনুযায়ী, সব ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পে শুল্ক-কর অব্যাহতি মিলবে না। এ ছাড়া একই অনুষ্ঠানে আরেকটি অনুশাসন দেন, শুধু জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে আমদানি করা অনুদানসামগ্রীর ক্ষেত্রেই শুল্ক-কর ছাড় মিলবে। ওই বৈঠকে সব ধরনের কর অব্যাহতি সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে কর প্রদানে উৎসাহিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

বৈঠকের পরের তিন বছর এ নিয়ে আর তেমন কোনো উচ্চবাচ্য ছিল না। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘বিভিন্ন খাতে কর অব্যাহতি যতটা সম্ভব পরিহার করা হবে। অস্বাভাবিক কোনো কারণ ব্যতীত এসআরও (প্রজ্ঞাপন) জারি করা আমরা পরিহার করব। এর ফলে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আসবে। সরকারের প্রতি ব্যবসায়ীদের আস্থাও বাড়বে।’

ছয় বছর আগের ওই বৈঠকের ওই অনুশাসন ও তিন বছর আগের অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ধরে এখন নড়েচড়ে বসেছে এনবিআর। এ নিয়ে সম্প্রতি এনবিআরের চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমাতুল মুনিম দেশের ২৮১ জন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়েছেন। তাঁরা সবাই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ নির্বাহী। চিঠিতে সাবেক অর্থমন্ত্রীর অনুশাসন ও বর্তমান অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা থেকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সরকারি–বেসরকারি প্রকল্পে আমদানি শুল্ক, আয়কর ও ভ্যাট অব্যাহতির পরিবর্তে শুল্ক-করের হিসাব প্রাক্কলন করে অর্থ বিভাগ থেকে বরাদ্দ নিয়ে তা পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে এনবিআরের সদস্য হোসেন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় শুল্ক-কর অব্যাহতি দেওয়া হয়। অনেকে মনে করেন, সব প্রকল্পেই এই সুবিধা পাওয়া যাবে। আসলে তা নয়। তাই প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির সময় যেন শুল্ক-কর বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়, সেটাই বলা হয়েছে।

গত বছর এনবিআরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকারি ভৌত প্রকল্প ও বেসরকারি খাতে সব মিলিয়ে বছরে আড়াই লাখ কোটি টাকার মতো শুল্ক-কর ছাড় দেওয়া হয়। এর মধ্যে আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর ছাড় দেওয়া হয়েছে ৪৬ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা। আর রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য যদি বন্ড সুবিধা (শুল্ক-কর আরোপ না করা হতো) না দেওয়া হতো, তাহলে বছরে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা পাওয়া যেত। এ আয়কর ও ভ্যাট খাতে ছাড় দেওয়া হয়েছে আরও প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, প্রতিবারই প্রাক্–বাজেট আলোচনায় সবাই শুধু কর ছাড় চান। কেউ কর আহরণের সৃজনশীল খাতের কথা বলেন না। আবার অর্থমন্ত্রীকে কর ছাড় চাওয়া ওই ব্যবসায়ী শ্রেণিকেও খুশি করতে হয়। এর ফলে শুল্ক-কর আদায়ের জায়গা সীমিত হয়ে যাচ্ছে। যে ধরনের সংস্কার প্রয়োজন, তা হচ্ছে না। আবার এই সংস্কার এক দিনে সম্ভব নয়।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন