শেয়ারবাজার কতটা বাড়াতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন শেষ হয়েও হচ্ছে না। এবারের নির্বাচনে আবারও প্রমাণ হলো ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থনীতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর অর্থনীতির ওঠানামা পরিমাপের অন্যতম বড় সূচক শেয়ারবাজার।

যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্টদের শেয়ারবাজারে সরাসরি কোনো ভূমিকা নেই। তারপরও শেয়ারবাজারের উত্থান-পতনের জন্য প্রেসিডেন্টদের দায়ী করা হয়। এর সংগত কারণও আছে অবশ্য। কর নির্ধারণ করা, ব্যয়ের খাত ঠিক করা, নতুন নতুন আইন ও উদ্যোগ—সবকিছুর ক্ষেত্রেই বড় ভূমিকা রাখেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কাজেই শেয়ারবাজারের উত্থান-পতনে তাঁর ভূমিকা থাকেই। এ ছাড়াও শেয়ারবাজারের নীতিনির্ধারকদেরও নিয়োগ দেন প্রেসিডেন্ট, তাই তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো দায়ই খুব বেশি এড়াতে পারেন না।

আবার যেহেতু প্রেসিডেন্টদের দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার তাড়না থাকে, ফলে শেয়ারবাজারের পরিবর্তনে তাঁরা ভূমিকা রাখতে চান। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বলাই হয়, ‘বোকারা তোমরা যাই ভাবছ না কেন, শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিই আসল’। ১৯৯২ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রচারণার দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপক জেমস কারভেইল ওপরের কথাটি বলেছিলেন। এখন এটাই মার্কিন প্রেসিডেন্টদের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।

বিজ্ঞাপন
default-image

মার্কিন ওয়েবসাইট ইনভেস্টোপিডিয়া এস অ্যান্ড পি-৫০০ সূচকের মাধ্যমে বলার চেষ্টা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টরা তাঁদের শাসনামলে কতখানি সফল ছিলেন। এস অ্যান্ড পি–৫০০ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত শীর্ষ ৫০০টি কোম্পানির সূচক। ১৯৫৩ সাল থেকে করা এই সূচক থেকে দেখা যায়, এই সময়ের মধ্যে আমেরিকার সফলতম প্রেসিডেন্ট ডেমোক্র্যাট পার্টির বিল ক্লিনটন। সুদর্শন এই প্রেসিডেন্ট তাঁর সময়কালে নারী কেলেঙ্কারির মতো বিপদেও পড়েছিলেন, এমনকি আদালতেও যেতে হয়েছিল তাঁর। তবে তাঁর প্রথম আমলে ১৯৯৩-৯৭ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে শেয়ারবাজারে এস অ্যান্ড পি–৫০০ এগিয়েছিল ৭৯ দশমিক ২ শতাংশ আর ১৯৯৭ থেকে ২০০১ পর্যন্ত ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ। আমেরিকায় অনেক প্রেসিডেন্টই দুবার নির্বাচিত হয়েছেন, তবে অর্থনীতির এত স্থির ধারাবাহিকতা আর কেউ দেখাতে পারেননি।

প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের পরই অবস্থান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার। ওবামা তাঁর প্রথম সময়কালে শেয়ারবাজারকে ৮৪ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছিলেন, যা তাঁর পূর্বসূরি বিল ক্লিনটনের চেয়েও বেশি। ওবামার সময়েই আমেরিকা স্মরণকালের দীর্ঘ মন্দায় পড়ে, ফলে দ্বিতীয় শাসনামলে এসে ওবামা শেয়ারবাজারকে মাত্র ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি করতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে অসফল প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির জর্জ ডব্লিউ বুশ বা বুশ জুনিয়র। ক্লিনটনের পরপর এসেই এই প্রেসিডেন্ট শেয়ারবাজারকে প্রথম আমলে ১২ দশমিক ৫ শতাংশের অবনতি ঘটান। তাঁর যুদ্ধবাজ নীতি পরের আমলে এসে শেয়ারবাজারকে পিছিয়ে দেয় ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। তাঁর মতো অসফল শুধু রিপাবলিকান পার্টির আরেক প্রেসিডেন্ট নিক্সন। যদিও নিক্সন তাঁর দ্বিতীয় আমল শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড এসেও এস অ্যান্ড পি–৫০০ সূচককে অবনতি থেকে রক্ষা করতে পারেননি। নিক্সন অবশ্য প্রথম আমলে ১৬ শতাংশ উন্নতি করে দেখিয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য শেষ হওয়া আমলের প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান পার্টির ডোনাল্ড ট্রাম্প এই এস অ্যান্ড পি–৫০০ সূচকে খুব সফল ছিলেন বলা যায় না। যদিও তিনি জর্জ জুনিয়ার বা নিক্সনের মতো ভরাডুবি ঘটাননি, বৃদ্ধির হার জর্জ হারবার্ট ওয়াকার বুশ বা বুশ সিনিয়রের চেয়েও খারাপ। বুশ সিনিয়রের আমলে সূচক বেড়েছিল ৫১ দশমিক ২ শতাংশ, আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৪৬ দশমিক ২ শতাংশ। বুশ জুনিয়রকে বাদ দিলে ট্রাম্পের চেয়ে অসফল ছিলেন কেবল রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান। তা–ও তাঁর প্রথম আমল ১৯৮১-৮৫ পর্যন্ত। সে সময়ে সূচক বাড়ে মাত্র ৩০ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হয়ে রিগ্যান সত্যিই শেয়ারবাজারে তাক লাগিয়ে দেন। সে আমলে সূচকের বৃদ্ধি ছিল ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টদের মধ্যে এটা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। প্রথম সর্বোচ্চ ৭০ দশমিক ৭ শতাংশ তুলেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার, তাঁর ১৯৫৩-৫৭ শাসনামলে।

বিজ্ঞাপন
default-image

সব হিসাবে ট্রাম্পকে বেশ অসফলই বলা যায়। ট্রাম্প না বুশ বাপ-বেটার মতো সরাসরি যুদ্ধ করেছেন, না তাঁকে বড় কোনো মন্দা দেখতে হয়েছে। শেষ এক বছর কোভিড-১৯ বা তাঁর নিজের ভাষায় ‘চাইনিজ ভাইরাসের’ সঙ্গে যুঝতে হয়েছিল। তবে শুধু চাইনিজ ভাইরাস নয়, চীনের সঙ্গে প্রতিদিনের বাণিজ্যযুদ্ধ খেলাও তাঁর আমলে শেয়ারবাজারকে বেশ প্রভাবিত করেছে।
এমনিতে ট্রাম্প মুখরা, উল্টাপাল্টা কথা বলে বেশ আলোচনায় থাকেন। তার ওপর ট্রাম্প আগে থেকেই বড় ব্যবসায়ী ও ধনী। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রেসিডেন্টরা যত না প্রেসিডেন্ট হয়ে আয় করেন, তার চেয়েও অনেক বেশি আয় হয় প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে বিভিন্ন বক্তৃতা, বই লেখা ও শুভেচ্ছাদূত হিসেবে। ট্রাম্প সেখানে কতটা বাজার পাবেন, তা–ও এখন প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়েই থাকছে।
সূত্র: ইনভেস্টোপিডিয়া

মন্তব্য পড়ুন 0