ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) রপ্তানিতে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা বা জিএসপি সনদ প্রদান সহজ করতে রেজিস্টার্ড এক্সপোর্টার্স সিস্টেম বা রেক্স চালু হচ্ছে আগামী রোববার। এটি হলে রপ্তানিকারক নিজেই শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার ঘোষণা ‘স্টেটমেন্ট অন অরিজিন’ দিতে পারবে। তাতে রপ্তানিকারকদের সময় ও অর্থ দুটোই বাঁচবে।

নতুন এই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে অন্তর্ভুক্ত হতে প্রতিটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। ট্রেড লাইসেন্স, রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (ইআরসি), ফায়ার লাইসেন্স, পরিবেশ সনদ ও ভবন নিরাপত্তা সনদ যাচাই-বাছাই ও কারখানা বা কার্যালয় পরিদর্শন করে এই নিবন্ধন দেবে ইপিবি। সেখান থেকেই নিবন্ধনটি প্রতিবছর নবায়ন করতে হবে রপ্তানিকারকদের। বর্তমানে ইপিবির প্রধান কার্যালয়সহ আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে রপ্তানিকারকদের জিএসপি সনদ নিতে হয়। এতে সময়ের সঙ্গে অর্থেরও অপচয় হয়।

ইপিবির কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, রেক্স পদ্ধতি স্বচ্ছ হওয়ায় অনিয়মের সুযোগ থাকবে না। সময় ও ব্যয় হ্রাস পাবে। অনলাইনে ২৪ ঘণ্টাই সেবা নেওয়া যাবে। ছুটির দিনেও সেবা বন্ধ থাকবে না। তৃতীয় কোনো দেশ থেকে বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত সুবিধা গ্রহণের সুযোগ নেওয়া বন্ধ হবে। স্বয়ংক্রিয় হওয়ায় সেবাটি নিতে রপ্তানিকারকদের জনবল আগের চেয়ে কম লাগবে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৫১টি দেশ ইইউতে শুল্কমুক্ত পণ্য রপ্তানির সুবিধা পায়। সদ্য বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট ৪ হাজার ৫৩ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানির ২ হাজার ২৮৫ কোটি ডলার বা ৫৬ শতাংশ গেছে ইইউতে। ইইউ রপ্তানিকারক পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত ও জিএসপি সনদ প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করতে ২০১০ সালে রেক্স বাস্তবায়ন শুরু করে। ইতিমধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় রেক্স চালু হয়েছে।

তৃতীয় পর্যায়ে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশ রেক্স পদ্ধতিতে প্রবেশ করে। এ ক্ষেত্রে জিএসপির রুলস অব অরিজিন (কাঁচামালের উৎস বিধিবিষয়ক শর্ত) অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ এবং ইইউ কর্তৃপক্ষকে প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়ার জন্য ইপিবিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নতুন পদ্ধতিটি বাস্তবায়নের জন্য একটি নীতিমালা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে খসড়া নীতিমালা করা হয়েছে।

জানতে চাইলে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগামী রোববার বিকেলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি রেক্সের উদ্বোধন করবেন। নিবন্ধন পাওয়ার পর থেকেই রপ্তানিকারকেরা সুবিধাটি পাবেন। চলতি বছরের মধ্যেই আমরা রপ্তানিকারকদের রেক্স নিবন্ধন নম্বর দেওয়ার কাজটি শেষ করব।’

নিবন্ধনের বিষয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, নিবন্ধন দেওয়ার ক্ষেত্রে যেসব রপ্তানিকারক সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করছে, তাদের কারখানা পরিদর্শন করা হবে না। তবে যারা অনিয়মিত কিংবা যাদের দুর্নাম আছে, তাদের ক্ষেত্রে পরিদর্শন হবে। তিনি আরও বলেন, রেক্সের কারণে রপ্তানিকারকদের সময় ও খরচ বাঁচবে। আপাতত কোনো ধরনের ফি ছাড়াই সেবাটি নিতে পারবেন ব্যবসায়ীরা।

জানতে চাইলে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, উদ্যোগটি চমৎকার। তবে নতুন পদ্ধতির অপব্যবহার ঠেকাতে ইপিবিকে শক্ত তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় সুবিধার অপব্যবহার হতে পারে। কারণ, ঘরে বসেই নিজের সনদ নিজে ইস্যু করবে রপ্তানিকারকেরা।

খসড়া নীতিমালায় রেক্স পদ্ধতির অপব্যবহার বন্ধ করাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নীতিমালার মুখবন্ধে বলা হয়েছে, কাঁচামাল আমদানিনির্ভর পণ্য উৎপাদনে রুলস অব অরিজিন প্রতিপালন, তৃতীয় দেশ থেকে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশের নামে রুলস অব অরিজিন সনদ প্রতিপালন করার সনদ দাখিল, পণ্যের মূল্য কম বা বেশি দেখানোর বিষয়টি যথাযথভাবে তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করাটা চ্যালেঞ্জিং। তাই খসড়া নীতিমালায় জালিয়াতি রোধে ইপিবিকে যেকোনো সময় রপ্তানিকারকদের কারখানা, অফিস পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট দলিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া রাখা হয়েছে জরিমানাসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, রেক্স পদ্ধতি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। ইপিবির কর্মকর্তারা সারাক্ষণই অনলাইনে তদারকি করবেন। কোথাও কোনো অসামঞ্জস্য দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন