যেভাবে চলছিল তাতে ইউরোপের দেশগুলোর জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এমনিতেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করত। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে সরকার নিজেই কয়েকটি সবজি ও ফল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) গত ২৭ এপ্রিল তিন ধরনের প্রজাতির সবজি ও ফল বাংলাদেশ থেকে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। এগুলো হলো: অ্যামারেনথাস প্রজাতি (লালশাক ও ডাঁটাশাক), সাইট্রাস প্রজাতি (জারা লেবু ছাড়া অন্যান্য লেবু) এবং ত্রিকোসানথেস প্রজাতি (করলা, চিচিঙ্গা, ধুন্দল ও পটোল)।
এসব সবজি-ফলের স্বাস্থ্যসনদ (ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেট-পিসি) ইস্যু করা বন্ধ করে দিয়েছে ডিএই। এই পিসি ছাড়া কেনো সবজি-ফল রপ্তানি করা যায় না। অবশ্য ইউরোপের বাইরে এসব সবজি-ফল রপ্তানি করতে পারবেন রপ্তানিকারকেরা।
ডিএইর উদ্ভিদ সংগনিরোধ শাখার পরিচালক ছবি হরিদাসের সই করা আদেশে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি সচল রাখার স্বার্থে এ আদেশ প্রতিপালনের জন্য অনুরোধ জানানো হলো।’
জানতে চাইলে অতিরিক্ত কৃষিসচিব ও বীজ উইংয়ের মহাপরিচালক আনোয়ার ফারুক বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তিতে চাষ, যথাযথ মোড়কীকরণের মতো কয়েকটি বিষয়ে জোর দিতে বলেছিল। কিন্তু রপ্তানিকারকেরা তা করেননি। সে কারণে আমরা এসব সবজির রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছি।’ নিষেধাজ্ঞা কত দিন চলবে—জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে সাভার, নরসিংদী, সোনারগাঁও, কুমিল্লায় অঞ্চল ঠিক করে সেখানকার কৃষকদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। রপ্তানিকারকেরা যতক্ষণ এসব এলাকার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কৃষকের উৎপাদিত সবজি না নেবে এবং যথাযথভাবে মোড়ক না করবে তত দিন পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা চলবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশে ইইউ কার্যালয়ের বাণিজ্য উপদেষ্টা জিল্লুল হাই রাজী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, বিষয়টি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ব্যর্থতা। পিসি ছাড়া এ দেশ থেকে সবজি-ফল রপ্তানি হয় কীভাবে? এ বিষয়ে সরকারের আরও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।’
ইইউ, ডিএই এবং রপ্তানিকারকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সবজি-ফলে কয়েক দফা পোকা এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পাওয়ায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ থেকে তাদের দেশে সবজি-ফল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার হুমকি দেয় ইইউ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইইউ তা করেনি। এর বদলে কয়েকটি শর্ত দেয় সংস্থাটি। এর একটি হলো, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর বাংলাদেশের কোনো রপ্তানি পণ্য টানা পাঁচবার সমস্যা পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আটক হলে (ইন্টারসেপশন) ওই পণ্যের ওপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।
ডিএইর আদেশে বলা হয়েছে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে ইইউতে অ্যামারেনথাস প্রজাতির পণ্য ১৫ দফায় আটক হয়েছে। ত্রিকোসানথেস প্রজাতির পণ্য ছয় দফা আটক হয়েছে। ফলে এই দুই প্রজাতির ছয় ধরনের শাকসবজি ও ফল, যেমন: লালশাক ও ডাঁটাশাক, করলা, চিচিঙ্গা, ধুন্দল ও পটোলকে মারাত্মক সমস্যাযুক্ত পণ্য (ক্রিটিক্যাল কমোডিটি) হিসেবে ঘোষণা করে।
ইইউ ‘ক্রিটিক্যাল কমোডিটি’ হিসেবে সেসব সবজি-ফলকেই চিহ্নিত করে, যেগুলো তাদের দেশে প্রবেশ করলে স্থানীয় ফসল ওই রোগ কিংবা পোকায় সংক্রমিত হতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আরও বলেছে, এপ্রিল মাসেই এই তিন প্রজাতির সবজি-ফল ২৫ দফা আটক হয় ইইউভুক্ত দেশগুলোতে। ফলে ইইউতে শাকসবজি ও ফল রপ্তানি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রপ্তানিকারকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, করলা, চিচিঙ্গা, ধুন্দুল ও পটোলকে ইইউ ‘ক্রিটিক্যাল কমোডিটি’-এর তালিকায় রেখেছে মাছি পোকার (ফ্রুট ফ্লাই) কারণে। আর লেবুতে একধরনের ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে, যা লেবুতে ক্যাঙ্কার নামক রোগের সৃষ্টি করে। একই ধরনের পোকা কিংবা রোগ যেন তাদের ফসলে না ছড়ায় সে জন্যই এসব পণ্যকে ঝুঁকিপূর্ণ বলছে ইইউ।
তবে রপ্তানিকারকেরা বলছেন, জারা লেবু রপ্তানি করতে পারবেন তারা। এই লেবুটা নরসিংদী ও সিলেটে উৎপন্ন হয়। এর প্রায় সবটাই রপ্তানি হয়, তাই বাজারে পাওয়া যায় না।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ফ্রুটস ভেজিটেবলস এলাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা মনজুর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভালোভাবে চাষাবাদের মাধ্যমে পোকা ও রোগমুক্ত সবজি-ফল উৎপন্ন করে আমরা তা রপ্তানি করব। এ নিয়ে আমরা কাজ করছি। বিভিন্ন এলাকা চিহ্নিত করে সেই এলাকায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় চাষাবাদের প্রক্রিয়া চলছে।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0