>

default-image

মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও সম্পূরক শুল্ক আইন হয়েছে ২০১২ সালে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে আইনটি বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনো জটিলতা কাটেনি। ব্যবসায়ীরা এ আইন বাস্তবায়নের আগে বেশ কিছু সংশোধনীর দাবিতে অনড়। মূসক আইন নিয়ে জটিলতা ও এফবিসিসিআইয়ের প্রস্তাব নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন সংগঠনটির সহসভাপতি মো. শফিউল ইসলাম।সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজীব আহমেদ

প্রথম আলো: মূসক আইন হয়েছে বেশ কয়েক বছর হলো। এখন সরকার সেটা বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে। সেখানে আপনারা কী কী সমস্যা দেখছেন?

শফিউল ইসলাম: মূসক আইন সর্বজনীন নয়, দেশভেদে আলাদা। ১৯৫৪ সালে ফ্রান্সে প্রথম মূসক প্রবর্তন হয়। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য দেশ মূসক প্রবর্তন করে। মূসক হলো যে মূল্য সংযোজন করা হবে, তার ওপর আরোপ করা কর। একটি দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ও অন্যান্য পরিপ্রেক্ষিতে মূসক আইন তৈরি হয়। আমরা চিন্তিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের নিয়ে। বর্তমান অবস্থায় মূসক আইন বাস্তবায়িত হলে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

প্রথম আলো: ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সমস্যা কী?

শফিউল ইসলাম: একজন শিঙাড়া বিক্রেতার কথা ধরি। তিনি আটা, তেল, আলুসহ অন্যান্য পণ্য কিনে শিঙাড়া তৈরি করেন। ১০০ টাকা খরচ করে তিনি যদি ১১০ টাকা বিক্রি করেন, তাহলে তাঁর মূল্য সংযোজন হলো ১০ টাকা। ওই ১০ টাকার ওপর মূসক আরোপ করা হবে। কিন্তু উপকরণ কেনার সময় তিনি যে রেয়াত দিয়ে এসেছেন, তার হিসাব দিতে না পারলে তারা ১১০ টাকার ওপর মূসক বসিয়ে দেবে। আমাদের কথা হলো, এ ধরনের প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে হিসাব রাখতে অভ্যস্ত নন। রেয়াত পেতে যেসব নথি দাখিল করতে হবে, সেগুলো রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অনেক দূর যেতে হবে। এখানে শিক্ষা একটি বিষয়, সচেতনতা একটি বিষয়।

প্রথম আলো: এ সমস্যা থেকে উত্তরণে আপনাদের প্রস্তাব কী?

শফিউল ইসলাম: আমরা তো বলছি, বছরে ৩৬ লাখ টাকা পর্যন্ত কেনাবেচা করা ব্যক্তিরা মূসকের আওতায় আসবেন না। তারা এটাকে ৩০ লাখে রাখতে চায়। এটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তারা বলছে সবাইকে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) ব্যবহার করতে হবে। সেটা কি তারা দিতে পারবে?

প্রথম আলো: ব্যবসায়ীদের কি এখন হিসাব রাখা শুরু করা উচিত নয়? তাঁদের প্রস্তুত হতে আর কত দিন সময় লাগবে?

শফিউল ইসলাম: আমরা প্রত্যাশা করি, প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা হিসাব রাখুন। একজন ডাব বিক্রেতারও তিন লাখ টাকার লেনদেন হয়। কিন্তু সমস্যা হলো তাঁরা সচেতন নন। আমরা বলছি, অনেক জায়গায় ২ শতাংশ মূসক ঠিক করে দেওয়া হোক। এটা অনেক দেশেই আছে, শুধু বাংলাদেশে নয়। মূসক আদায়ের ব্যবস্থা দেশের বাস্তবতা মাথায় রেখেই করতে হবে।

প্রথম আলো: এখনো ব্যবসায়ীরা পাকা রসিদ দিতে নারাজ। অনেক দিন ধরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পণ্য বিক্রিতে পাকা রসিদ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা তা দেন না। ব্যবসায়ীরা হিসাব রাখা, রসিদ দেওয়া—এসব চর্চা কবে শুরু করতে পারবেন?

শফিউল ইসলাম: হিসাবরক্ষণের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি হলো ‘ডাবল এন্ট্রি সিস্টেম অব বুক কিপিং’। কতজন এ সম্পর্কে জানেন? এক শ জনের মধ্যে একজন হয়তো পাওয়া যেতে পারে। এ বাস্তবতা মাথায় রাখতে হবে। আমাদের অনেক সচেতনতা কার্যক্রম চালাতে হবে। ধরুন, একজন আবাসন ব্যবসায়ী ভবন তৈরির সময় বালু কিনলেন। বালুর ওপর যে মূসক তিনি দেবেন, সেটি রেয়াত পাবেন। কিন্তু এ দেশে বালু ব্যবসায়ীরা কি মূসক দেন?

প্রথম আলো: সেটাই আমি বলছিলাম, বালু বিক্রেতার মতো ব্যবসায়ীরা কবে থেকে মূসক দেবেন? প্রস্তুতিতে কত দিন লাগবে?

শফিউল ইসলাম: সারা পৃথিবীতেই এ ধরনের ঘাটতি আছে। সেখানে সহজ মূসকের ব্যবস্থা ও রেয়াত নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। তারাই হিসাব করে দেখাচ্ছে বিভিন্ন পর্যায়ে আলাদা হারে মূসক আদায় করলে মোট মূসক আদায় বেশি হবে।

প্রথম আলো: আপনারা কি মনে করছেন, মূসক আইন বাস্তবায়নের জন্য সরকারের ওপর কোনো চাপ আছে?

শফিউল ইসলাম: কখনো কখনো আমাদের ধারণা দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের চাপে এটা করা হচ্ছে। আমরা আসল বিষয় জানি না। তবে বাংলাদেশ কিন্তু সেই অবস্থা থেকে বেড়িয়ে এসেছে। এত কিছুর পরও আমরা নিজেদের অর্থ দিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করছি। বিদেশি সংস্থাগুলো ভর্তুকি বন্ধ করার কথা বলে। উন্নত বিশ্ব কি ভর্তুকি বন্ধ করেছে? তারা কি কৃষিতে ভর্তুকি দেয় না? সুতরাং, যার যার দেশের অর্থনীতির সুরক্ষা যার যার দেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী করা হয়। তারা বলল, আপনাদের তো মূসক আইন বোঝার জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। এখন আমরা বাস্তবায়ন করে ফেলব। এখানে বিরাট একটা ভুল-বোঝাবুঝি আছে। সরকারই বলেছে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করা সরকারের কাজ। আমরা মনে করছি, এটা সহযোগিতা নয়, বরং প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে। আমাদের দায়িত্ব হলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বোঝানো। সেটা আমরা ধারাবাহিকভাবে করছি। আমরা বলছি, যেসব বিষয়ে আমরা একমত হয়েছিলাম, সেগুলো আগে বাস্তবায়ন করি। এরপর সমস্যা হলে আমরা বসে সমাধান করব। এটাই আমাদের মূল দাবি।

প্রথম আলো: আপনারা কোন কোন বিষয়ে একমত হয়েছিলেন? সেগুলোর কী অবস্থা?

শফিউল ইসলাম: মূসক আইনে সমস্যা আছে বলেই ২০১৪ সালে এনবিআর ও এফবিসিসিআইয়ের একটি যৌথ কমিটি হয়েছিল। ওই কমিটি বিশদ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছু বিষয়ে একমত হয়। কিন্তু সেগুলো এনবিআর এখন আর মাথায় রাখছে না। এ আইনে অনেক ভালো দিকও আছে। ব্যবসায়ীরা অনলাইনে নিবন্ধন করতে পারবেন। তবে ব্যবসায়ীদের অনেকের মধ্যে কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা আছে। আবার আদায়কারীদের অনেকের মধ্যেও হয়রানির চেষ্টা থাকে। এখানেই অসদুপায় অবলম্বনের বিষয়টি চলে আসে। এখানে দুই পক্ষকেই ঢালাওভাবে দায়ী করা যাবে না।

প্রথম আলো: বর্তমান অবস্থায় আইনটি বাস্তবায়ন করা হলে কী হবে?

শফিউল ইসলাম: আইন মানুষের জন্য করা হয়। মানুষ যদি মনে করে একটি আইনের কারণে সে অত্যাচারিত হবে, তাহলে সেই আইন বাস্তবায়নযোগ্য হয় না। মূসক আইনের কারণে ব্যবসায়ীরা সংক্ষুব্ধ হলে সরকারের দুটি দিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একদিকে কর আদায়ে পিছিয়ে যাবে, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সরকার দূরে সরে যাবে। এটা দেশের অর্থনীতির জন্য মোটেও মঙ্গলজনক নয়।

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন