সিমেন্টশিল্পকে সরকারের সহায়তা করা উচিত

বাংলাদেশে সিমেন্ট খাতে বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও বিদ্যমান সমস্যা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন হাইডেলবার্গসিমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেডের বিক্রয় ও বিপণন পরিচালক সায়েফ নাসির। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরিফুর রহমান

সায়েফ নাসির

প্রশ্ন :

করোনার কারণে অন্য ব্যবসার মতো সিমেন্ট ব্যবসায়ও মন্দাভাব তৈরি হয়েছিল। সেই মন্দা কেটেছে কি?

সায়েফ নাসির: করোনার কারণে গত বছর সিমেন্ট ব্যবসায় যে মন্দাভাব ছিল, সেটি অনেকটাই কেটে গেছে। অন্য যেকোনো শিল্পের চেয়ে সিমেন্টশিল্প এখন বেশ এগিয়ে। কারণ, বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর দিকে যারা কাজ অসম্পূর্ণ রেখেছিল, তারা পুনরায় কাজে হাত দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, করোনার মধ্যেও প্রবাসীদের টাকা (রেমিট্যান্স) দিয়ে অনেকে বাড়ি নির্মাণ করছে। তৃতীয়ত, সরকারের বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণকাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। জানুয়ারি থেকে দেশজুড়ে সিমেন্টের ব্যবহার বেড়েছে। এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে সিমেন্ট ব্যবসা ভালোই হবে।

প্রশ্ন :

আপনাদের প্রতিষ্ঠান হাইডেলবার্গসিমেন্ট ও আপনাদের পণ্য সম্পর্কে জানতে চাই।

সায়েফ নাসির: হাইডেলবার্গসিমেন্ট হচ্ছে জার্মানভিত্তিক একটি বহুজাতিক কোম্পানি। এটি ১৪৮ বছরের পুরোনো কোম্পানি। বিশ্বের ৬০টির বেশি দেশে আমাদের কোম্পানির কার্যক্রম চলছে। বৈশ্বিক ব্যবসার দিকে তাকালে দেখি, নির্মাণ উপকরণের দিক দিয়ে হাইডেলবার্গসিমেন্ট বিশ্বের প্রথম সারির তিনটি কোম্পানির একটি। বাংলাদেশে কোম্পানিটি কার্যক্রম শুরু করে ১৯৯৮ সালে। এ বছর হাইডেলবার্গসিমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেডের দুই যুগ পূরণ হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে আমাদের দুটি ব্র্যান্ডের সিমেন্ট রয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের জন্য রুবিসিমেন্ট, আর অন্যান্য বিভাগের জন্য স্ক্যানসিমেন্ট। বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের বাইরে ব্যক্তিগত বাসাবাড়ি নির্মাণে আমাদের সিমেন্টের বেশি ব্যবহৃত হয়।

প্রশ্ন :

বাংলাদেশে অন্য সিমেন্টের চেয়ে হাইডেলবার্গসিমেন্টের ভিন্নতা কোথায়?

সায়েফ নাসির: স্ক্যানসিমেন্ট ও রুবিসিমেন্ট—দুটিই সর্বোচ্চ মানের। যেকোনো গ্রাহকের কাছে রুবি ও স্ক্যানসিমেন্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে তারাই এর মান সম্পর্কে বলবে। আমাদের সিমেন্টের বিশেষত্ব হলো, প্রযুক্তির ব্যবহার, ভালো মানের কাঁচামাল এবং সেবার মানসিকতা। সিমেন্ট বিক্রি করেই চলে গেলাম, আমাদের সে রকম মানসিকতা নেই। একটা উদাহরণ দিয়ে বলি, পদ্মা সেতুর মূল কাঠামোর ৯৮ শতাংশই নির্মিত হয়েছে স্ক্যানসিমেন্ট দিয়ে। অন্য কোম্পানির সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়েছে সংযোগ সড়কে অথবা নদীশাসনে। কিন্তু আমাদের সিমেন্ট ব্যবহার হয়েছে সেতুর মূল কাঠামো নির্মাণে। এখান থেকে বুঝতে হবে, আমাদের সিমেন্টের ওপর আস্থা কোন অবস্থানে থাকতে পারে।

প্রশ্ন :

সরকারের কোন কোন বড় প্রকল্পে আপনাদের সিমেন্ট ব্যবহৃত হচ্ছে?

সায়েফ নাসির: সরকারের বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পে রুবিসিমেন্ট ব্যবহৃত হচ্ছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ, চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলওয়ে প্রকল্প, চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড, কালুরঘাট থেকে চাক্তাই সড়ক এবং বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প, দোহাজারী সেতু এবং মাতামুহুরী সেতু, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্প, মাতারবাড়ী প্রকল্প এবং কক্সবাজার বিমানবন্দর রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্প।

প্রশ্ন :

বাংলাদেশে সিমেন্টশিল্পের সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?

সায়েফ নাসির: বাংলাদেশে সিমেন্ট ব্যবসার সম্ভাবনা প্রচুর। গত এক দশকে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি গড়ে ৬ শতাংশ হারে বেড়েছে। ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। আগামী ৫ থেকে ১০ বছর নির্মাণশিল্পেও প্রবৃদ্ধি হবে। তবে দেখার বিষয় হলো, উচ্চ করের কারণে কতটা মুনাফা হবে। বর্তমানে ক্লিংকার আমদানিতে প্রতি টনে ৫০০ টাকা কর দিতে হয়। অগ্রিম কর দিতে হয় ২ শতাংশ। এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট দিতে হয়। এক প্যাকেট সিমেন্ট যদি ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়, তার মধ্যে ৬০ টাকা সরকারকে রাজস্ব দিয়ে দিতে হয়। তাই এই শিল্পকে সরকারের সহযোগিতা করা উচিত।