default-image

হঠাৎই এক লোকের ওপর চটে গেলেন এক সবজি বিক্রেতা। খানিক দূরে দাঁড়িয়ে আমি। দোকানি টাকা চাইছেন, আর লোকটা বারবার সময় চাইছেন। দোকানির সাফ কথা, বাকির টাকা না দিলে আর কিছু বিক্রি করবেন না তিনি। লোকটি বলছেন, এই তো কয়েক দিন পরেই তিনি সব টাকা দিয়ে দেবেন। কিন্তু দোকানি শুনতে নারাজ। পরে আশপাশের দোকানিদের অনুরোধে মন গলল ওই দোকানির। বাকিতে কিছু সবজি নিলেন লোকটি। ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল শুক্রবার সকালে গাইবান্ধা শহরের নতুন বাজারে।

পাশে দাঁড়িয়ে বিষয়টি দেখার পর পিছু নিলাম লোকটির। হাতে কিছু বাজার নিয়ে ফিরছেন বাড়ি। পথের মধ্যে থামিয়ে জানলাম তিনি একজন স্কুলশিক্ষক। নাম শাহ আলম। বাড়ি শহরের ডেভিট কোম্পানিপাড়ায়। আলাপে আলাপে জানা গেল, ১৯৯৪ সালে স্নাতক পাসের পর ২০১৩ সালে এসে এলএলবি পাসও করেছেন। স্নাতক পাসের পরপরই বিয়ে করেছেন। যখন বিয়ে করে সংসার শুরু করেন, তখন তিনি ছিলেন বেকার। নানা জায়গায় ঘুরেও কোনো চাকরি পাননি। বাধ্য হয়ে অল্প কিছু বেতনে ১৯৯৯ সালে গাইবান্ধা শহরের ল কলেজ কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা শুরু করেন। এখন তিনি সেই কিন্ডারগার্টেনের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। ছোটদের এ স্কুলে বর্তমানে শিক্ষক–কর্মচারী আছেন ১১ জন আর শিক্ষার্থী প্রায় ৩০০ জন।

শাহ আলমের একমাত্র মেয়ে সোনিয়া সুলতানা গাইবান্ধা সরকারি মহিলা কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। স্ত্রী জাকিয়া সুলতানাকে নিয়ে তাঁর তিন সদস্যের সংসার। কিন্ডারগার্টেন থেকে মাসে বেতন পান মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। পৈতৃক বাড়িতে থাকেন বলে বাসাভাড়া লাগে না। শাহ আলমের তিন ভাই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। প্রতি মাসে নিয়মিতভাবে কিছু অর্থসহায়তা দেন তাঁরা। তাতে টেনেটুনে সংসার চলে যাচ্ছিল। কিন্তু করোনা এসে টানাটানির সংসারে দুর্দশা নামিয়ে এনেছে। গত বছরের মার্চ থেকে শাহ আলমের কিন্ডারগার্টেনটি বন্ধ। তখন থেকে কোনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না।

বিজ্ঞাপন
বেতন না পেয়ে আমার প্রতিষ্ঠানের চারজন শিক্ষক চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁরা অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। কিন্তু আমি অভাবের কথা কাউকে বলতেও পারছি না লজ্জায়
শাহ আলম, স্কুলশিক্ষক

আলাপে আলাপে শাহ আলম আরও জানান, অনেক বছর ধরে যখনই দরকার হয়েছে ভাইদের শরণাপন্ন হয়েছেন। তাঁরাও সামর্থ্য অনুযায়ী সব সময় সহায়তা দিয়েছেন। কিন্তু এখন ভাইদেরও ব্যবসা বন্ধ, তাঁদের কাছ থেকেও আপাতত কোনো সহায়তা মিলছে না। এক বছর ধরে এ অবস্থা চলছে। কত দিন ভাইবোন বা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে চলা যায়? এ প্রতিবেদকের কাছে প্রশ্ন রাখেন শাহ আলম।

এদিকে চাল-ডাল, সবজি আর ওষুধের দোকানে সব মিলিয়ে শাহ আলমের বাকি পড়েছে প্রায় এক লাখ টাকা। এক বছর ধরে বাকিতে পণ্য দিতে দিতে এখন দোকানদারও শাহ আলমের ওপর বিরক্ত। তাই তিনি দোকানে গেলেই তাঁর সঙ্গে চড়া গলায় কথা বলেন দোকানিরা। কেউ কেউ বিরক্ত হলেও একজন শিক্ষকের প্রতি সহানুভূতি দেখান কেউ কেউ। তাই এক বছর ধরে বাকিতে বাজার করে দিন পার করতে পারছেন শাহ আলম।

শিক্ষক শাহ আলম বলেন, ‘বেতন না পেয়ে আমার প্রতিষ্ঠানের চারজন শিক্ষক চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁরা অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। কিন্তু আমি অভাবের কথা কাউকে বলতেও পারছি না লজ্জায়। স্কুলটির জন্য কিছু সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছেও গিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি জানালেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সহায়তা দেওয়ার সুযোগ নেই।’

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন