বিশ্ববাজারের দাম, ডলারের দর ও জাহাজভাড়া মিলিয়ে দেশে আনার খরচ কত, তা পর্যালোচনা করতে হবে এবং দেশে সে অনুযায়ী প্রভাব পড়ল কি না, সেটা দেখতে হবে।
মোস্তফা আবিদ খান, সাবেক সদস্য, ট্যারিফ কমিশন

দাম কতটা কমল

বাংলাদেশ এবার চাল আমদানির চিন্তা করছে। বিশ্ববাজারে চালের দাম কমছে। ট্যারিফ কমিশনের তথ্য বলছে, থাইল্যান্ডে চালের দাম এক মাসে ৭ থেকে ৮ শতাংশ কমেছে। এক মাস আগে ৫ শতাংশ ভাঙা সেদ্ধ চালের টনপ্রতি দাম ছিল ৪৭৩ ডলার, যা বুধবার ৪৪১ ডলারে নেমেছে।

রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে রপ্তানি বন্ধের পর কয়েক মাস গমের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছিল। এক মাস ধরে সেটা কমছে। এক মাস আগে টনপ্রতি গমের দাম ছিল ৫০৬ ডলার। বুধবার ৪৫৩ ডলারে নামে।

চিনির দাম কমছে এক সপ্তাহ ধরে। এক সপ্তাহ আগে অপরিশোধিত চিনির টনপ্রতি দর ছিল ৪৪৩ ডলার, যা বুধবার ৪১৫ ডলারে বিক্রি হয়। চিনির এই দর ব্রাজিলের, যেখান থেকে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণে আমদানি করে।

সয়াবিন তেলের মতো কমেছে পাম তেলের দামও। যে অপরিশোধিত পাম তেলের দাম টনপ্রতি ১ হাজার ৬৯০ ডলারে উঠেছিল, বুধবার তা নেমে আসে ১ হাজার ২৩০ ডলারে। এক মাসে দাম কমেছে ২৭ শতাংশ।

অস্ট্রেলিয়ার মসুর ডালের দাম কমেছে ১৪ শতাংশের বেশি। এক মাস আগে মসুর ডালের দাম ছিল টনপ্রতি ৭০০ ডলারের বেশি, যা বুধবার ৬০১ ডলারে নামে।

ট্যারিফ কমিশনের হিসাব বলছে, বিশ্ববাজারে চাল, গম, ডাল, তেল ও চিনির দাম কমছে। দেশের দর পর্যালোচনার পরামর্শ।

দাম কেন কমছে

বিশ্বজুড়ে করোনার প্রকোপ কমতে শুরু করার পরই গত বছরের শেষ দিক থেকে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছিল। গত ফেব্রুয়ারি রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর দাম লাফিয়ে বাড়তে থাকে। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) খাদ্যপণ্যের মূল্য নিয়ে যে সূচক প্রকাশ করে, তা এ বছর ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠেছিল। দুই মাস ধরে সূচকটি নিম্নগামী, অর্থাৎ বিশ্বজুড়ে দাম কমছে।

বাজার পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংস্থা ও বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণ বলছে, উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় এবং চাহিদা কিছুটা কমায় পণ্যের দাম কমছে। বিভিন্ন দেশ নিজেদের বাজার সামাল দিতে সংরক্ষণবাদী নীতি শিথিল করেছে। সেটাও দাম কমার কারণ।

যেমন গত এপ্রিলে পাম তেল রপ্তানিতে ইন্দোনেশিয়া নিষেধাজ্ঞা দেয়। এতে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যায়। মে মাসে আবার তা তুলে নেয় তারা। এখন ইন্দোনেশিয়া রপ্তানি বাড়াতে চাচ্ছে, কারণ তাদের যে মজুত আছে, তা নিয়ে কিছুটা বিপত্তিতে পড়েছে তারা।

গমের দাম কমার কারণ হিসেবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে এবার ভালো ফলন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ওদিকে রাশিয়ায় অনুকূল আবহাওয়া উৎপাদন বাড়াবে।

দেশেও দাম কমছে

দেশের পাইকারি বাজার ঢাকার মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে দাম নির্ভর করে বিশ্ববাজার পরিস্থিতির ওপর। পাইকারি বাজারে দাম কমছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, খাতুনগঞ্জে কোম্পানি ও সরবরাহের সময়ভেদে প্রতি লিটার পাম তেলের দাম কমেছে ৮ থেকে ১৬ শতাংশ। ১ জুন একটি কোম্পানির পাম তেলের দাম ছিল লিটারপ্রতি ১৫৩ টাকা, যা ১৪১ টাকায় নামে। আরেকটি কোম্পানি ১৫ দিন পরে সরবরাহের ক্ষেত্রে পাম তেলের সরবরাহ আদেশ (এসও) বিক্রি করছে লিটারপ্রতি ১২০ টাকা দরে। খাতুনগঞ্জের ২২ দিনে সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৭ টাকা কমেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সয়াবিন তেল আমদানি করতে সময় লাগে ৪০ দিনের মতো। তবে পাম তেল আসে ১৫ দিনের মধ্যে। ফলে পামের দাম বেশি কমেছে।

খাতুনগঞ্জে বিগত এক সপ্তাহে গমের দাম কমেছে ৩ শতাংশের মতো। ডালজাতীয় পণ্যের দামও কমেছে। প্রতি কেজি মাঝারি দানার মসুর ডাল ৯৭ থেকে কমে ৯৪ টাকায় নেমেছে। মটর ডালের দাম কমেছে ৪ টাকার মতো। বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫৭ টাকায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুরান ঢাকার এক ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববাজারে দাম কমতির দিকে থাকায় এটা আশা করা যায় যে দেশেও কমবে। তবে কোম্পানিগুলো কমাচ্ছে কি না, সেদিকে সরকারি নজরদারি দরকার।

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম]

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন