বাজেটের ১ শতাংশ টাকা খরচ না করেই প্রকল্প শেষ করে দিল সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। প্রকল্প শেষ করার পর তদারক সংস্থা বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ বিভাগকে (আইএমইডি) জানানো হয়নি। তিন বছরমেয়াদি প্রকল্পের পুরো সময়ে মাত্র এক কিলোমিটার সড়ক মেরামত করা হয়েছে। অথচ প্রকল্পে ২১৮ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের কথা ছিল।
২০১১ সালে ৩৮৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে গোপালগঞ্জ জেলার ১৬টি সড়ক উন্নয়নের জন্য এ প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু গোপালগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার এসব সড়কের কাজ বুঝে না পেয়েই প্রকল্পটি পাস করিয়ে নেয় সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এর ফলে কোনো কাজ না করেই প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ করে দেয় তারা। মেয়াদের তিন বছরে এই প্রকল্পে মাত্র এক কোটি ৬৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছে; যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের দশমিক ৪৩ শতাংশ। এই টাকা দিয়ে মাত্র টুঙ্গিপাড়া পৌরসভা এলাকার এক কিলোমিটার সড়ক মেরামত করা হয়েছে।
এমনকি প্রকল্প শেষ করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। প্রকল্প তদারকের দায়িত্বে থাকা বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ বিভাগের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
সম্প্রতি আইএমইডির এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এই প্রকল্পটির এ ধরনের ঘটনা ধরা পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করা পরিকল্পনা আইনশৃঙ্খলার পরিপন্থী।
উল্লেখ্য, সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন পদ্ধতির ১৪ দশমিক ১৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো প্রকল্পের কাজ অসমাপ্ত রেখে প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণার ক্ষেত্রে পরিকল্পনামন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর অনুমোদন নিতে হবে। বিনিয়োগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে অনুমোদনের এক মাসের মধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভাকে অবহিত করতে হবে।
কিন্তু ২০১৩ সালের জুন মাসে প্রকল্প শেষ করা হলেও সড়ক ও জনপথ বিভাগ এসব কিছুই করেনি। এরপর এ বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর আইএমইডির একটি প্রতিনিধিদলের প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনে এ ধরনের অনিয়মের ঘটনা ধরা পড়ে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই প্রকল্পের পরিচালক আবুল কাশেম ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘এলজিআরডির সড়কগুলো আমাদের দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা দেয়নি। এখন এলজিআরডি নিজেই এই সড়কগুলো মেরামত ও উন্নয়ন করতে চায়। তবে এটা সত্যি যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে এত টাকা ছিল না।’
প্রকল্প শেষ করতে হলে আইএমইডির অনুমোদন কেন নেওয়া হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সড়কগুলো হাতে না পাওয়ায় আন্তমন্ত্রণালয় সভায় সিদ্ধান্ত হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে না। এলজিইডি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে—এমন রাজনৈতিক চাপও ছিল। তাই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আর আইএমইডিকে জানানো হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইএমইডির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বাস্তবায়ন না করে প্রকল্প শেষ করে দেওয়া শৃঙ্খলাবিরোধী। আর প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারলে প্রকল্প নেওয়া উচিত নয়। এতে অর্থের অপচয় হয়, সরকারের মানবসম্পদের অপচয় হয়।
২০১১ সালের ৩ মে একনেকে প্রকল্পটি পাস করা হয়। তখন বলা হয়েছিল, প্রকল্পটির মাধ্যমে ১৬টি সড়ক উন্নয়ন করা হলে গোপালঞ্জের সঙ্গে বরিশাল, পিরোজপুর, মাদারীপুর, বাগেরহাট, ফরিদপুর ও নড়াইল জেলার যোগাযোগ সহজ হবে। সড়কগুলো গোপালগঞ্জ সদর, টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী, মুকসুদপুর উপজেলার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী চিতলমারী, নাজিরপুর, কালকিনি, রাজৈর, আগৈলঝাড়া, নগরকান্দা ও লোহাগড়া উপজেলার মধ্যে চলাচল সহজ হবে।
প্রকল্পের আওতাভুক্ত এই সড়কগুলো ২০০৪ সাল থেকে এলজিইডির নিয়ন্ত্রণে ছিল। প্রকল্পটি পাস হওয়ার পর এসব রাস্তা সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। কিন্তু পরের তিন বছরেও এসব রাস্তা সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেনি এলজিইডি। জানা গেছে, এমন পরিস্থিতিতে মধ্যমেয়াদি বাজেট-কাঠামোর আওতায় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রতিবছর, সেখান থেকে এই প্রকল্পে বরাদ্দ দিতে চায়নি সড়ক ও জনপথ বিভাগ।
এভাবেই প্রকল্প নেওয়ার পর তা বাস্তবায়ন হয় না নানা জটিলতায়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখ্ত প্রথম আলোকে বলেন, যেকোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেই বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত। কেননা, প্রকল্প প্রস্তাব থেকে অনুমোদন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেক সময় ও মেধা ব্যয় করতে হয়। অর্থেরও অপচয় হয়। তিনি মনে করেন, প্রতিটি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের একসঙ্গে কতগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন করার সক্ষমতা রয়েছে, তাও চিন্তা করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন