default-image

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) সব বাজারে পোশাক রপ্তানিতে ৫ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা চান পোশাক ও বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারা। তাঁরা বলছেন, পোশাকশিল্পের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হচ্ছে। ক্রেতারাও কাঙ্ক্ষিত দাম দিচ্ছেন না। পাঁচ বছরের জন্য নগদ সহায়তা দিলে পোশাক খাত আবার ঘুরে দাঁড়াবে।

রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে গতকাল সোমবার বিকেলে পোশাক ও বস্ত্র খাতের ব্যবসায়ীদের তিন সংগঠন—বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ নগদ সহায়তা প্রদানের দাবি করেন। একই সঙ্গে তারা পোশাক রপ্তানিতে উৎসে কর দশমিক ২৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা, করপোরেট কর কমানো, ভ্যাট অব্যাহতি, ঋণ পুনঃতফসিলের মেয়াদ দ্বিগুণ করা, রপ্তানি খাতের জন্য ডলারপ্রতি অতিরিক্ত ৫ টাকা বিনিময় হার প্রদানসহ বেশ কয়েকটি দাবি জানান তিন সংগঠনের নেতারা।

পোশাক রপ্তানিতে ৫ শতাংশ প্রণোদনা চাওয়ার পেছনের যুক্তি হিসেবে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক বলেন, ‘পোশাক খাতের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। গত এক মাসে ২২টি কারখানা বন্ধ করেছি। কারণ, তারা বেতন দিতে পারছে না। আমাদের বুঝতে হবে প্রাক্‌–নির্বাচনী সময়ে ক্রেতারা অর্ডার (ক্রয়াদেশ) কম দিয়েছেন। শুধু তা–ই নয়, দামও পড়ে গেছে। যার ফলে চলতি মাসে রপ্তানিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হতে পারে।’

বিজিএমইএর সভাপতি বলেন, ‘কৃষিপণ্য রপ্তানিতে সরকার ২০ শতাংশ প্রণোদনা দেয়। গত ১০ বছরে পণ্যটির রপ্তানি ১৯৪ শতাংশ বা ৪৩ কোটি ডলার বেড়েছে। হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি ৭-১০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয়। গত ১০ বছরে পণ্যটির রপ্তানি ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ বা ৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার বেড়েছে। কিন্তু নতুন বাজারে পোশাক রপ্তানিতে ৪ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয়। ১০ বছরে নতুন বাজারে পোশাক রপ্তানি ৪৫০ গুণ বা ৩৮০ কোটি ডলার বেড়েছে। তাই আজকে যদি আমরা ভর্তুকি দাবি করি, তাহলে মনে হয় না অন্যায় কিছু হবে। কারণ, আমরা এত শ্রমিকের কর্মসংস্থান দিয়েছি। আমরা মালিকেরা বিপন্ন হলে শ্রমিকের ভাগ্যও বিপন্ন হবে।’

রুবানা হক বলেন, ‘পোশাক খাত বর্তমানে ক্রান্তিলগ্নে পৌঁছেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে পোশাক রপ্তানিতে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও গত পাঁচ বছরের গড় প্রবৃদ্ধি মাত্র ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। তাই এই মুহূর্তে সাহায্য–সহযোগিতা না করলে আমাদের কষ্ট হবে। ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা দিলে সরকারের অতিরিক্ত ১১ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা লাগবে। ৫ লাখ কোটি টাকার বাজেটে এই অর্থ যৎসামান্য।’ শ্রমিকদের গৃহায়ণ, যাতায়াত ও রেশনিংয়ের জন্য বাজেট বরাদ্দের জন্য সরকারের উচ্চমহলে প্রস্তাব করা হবে বলেও জানান তিনি।

পোশাক রপ্তানিতে উৎসে কর দশমিক ২৫ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা ও সেটিকে চূড়ান্ত দায় হিসেবে গণ্য করা এবং করপোরেট কর ১২ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ করার দাবি করেন বিজিএমইএ সভাপতি। এ ছাড়া পোশাক রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে স্থানীয় বাজার থেকে সংগৃহীত সব পণ্য ও সেবাকে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখার পাশাপাশি পোশাকশিল্পে ব্যবহৃত গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের ভ্যাট প্রদান থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতির দাবি করা হয়।

 পোশাক খাতের রুগ্‌ণ কারখানার ব্যবসা গুটিয়ে নিতে ৩০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের দাবি করেন রুবানা হক। তিনি বলেন, ছোট ও মাঝারি কারখানা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারছে না। তাই তাদের নিরাপদ প্রস্থানের জন্য ৩০০ কোটি টাকার একটি জরুরি তহবিল গঠন করা প্রয়োজন।

আগামী ২০১৯–২০ অর্থবছরের বাজেটে বস্ত্রকলের আয়কর ১৫ শতাংশ অব্যাহত রাখার দাবি জানান বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, ২০১৫ সালের ৩০ জুন বস্ত্রকলের আয়কর ১৫ শতাংশ ধার্য করা হয়। মূলধন নিবিড় হওয়ায় বস্ত্রকল স্থাপনে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। তাই আয়কর হারটি অপরিবর্তিত রাখা উচিত। তিনি পোশাকশিল্পের মতো বস্ত্র খাতে সমভাবে করপোরেট ও উৎসে কর নির্ধারণ এবং ভ্যাট অব্যাহতির দাবি করেন।

নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মনসুর আহমেদ বলেন, আমদানি ও রপ্তানি পর্যায়ে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের ওপর ভ্যাট প্রযোজ্য না হলেও অনেক ক্ষেত্রে উৎসে ভ্যাট কর্তনের সব হিসাব ও দায়িত্ব রপ্তানিকারককে দেওয়া হয়েছে। এই বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করতে হচ্ছে। অথচ হিসাব রাখার দায়িত্ব সেবা প্রদানকারীর। পুরো প্রক্রিয়াটি থেকে রপ্তানিকারকদের অব্যাহতি দেওয়ার দাবি করেন তিনি।

বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা মূলধনি যন্ত্রপাতির ভিন্ন ভিন্ন অংশ আমদানির ক্ষেত্রে একই এইচএস কোডের আওতায় রেয়াতি হারে শুল্কায়নের দাবি করেন বিকেএমইএর সহসভাপতি। একই সঙ্গে বর্জ্য পরিশোধনাগার বা ইটিপি স্থাপনের জন্য আমদানি করা রাসায়নিকের শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য করার দাবি করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। নগদ সহায়তা পেতে চরম হয়রানির অভিযোগ করে তিনি বলেন, নগদ সহায়তা পাওয়ার জন্য অডিট ফার্ম থেকে সনদ নিতে চরম হয়রানিতে পড়তে হয়। তারপর বাংলাদেশ ব্যাংকে গেলেও একই অবস্থা। নগদ সহায়তা পেতে এক থেকে দেড় বছর সময় লেগে যায়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন