default-image

চরম সংকটের মুখে সরকার আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব পেশ করেছে। এই পরিস্থিতিতে বাজেট পেশ করার জন্য সরকারের প্রশংসা প্রাপ্য। মহামারির কারণে ব্যক্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই আমাদের প্রত্যাশা ছিল, রাজস্বের ক্ষেত্রে বাজেটে নানা ধরনের ছাড় দেওয়া হবে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেট কিছু ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর
অর্থবিলে ব্যক্তি শ্রেণির আয়কর হ্রাসের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই ব্যাপারটা বিশ্লেষণে করে দেখা যায়, যাদের বার্ষিক আয় ৪ লাখ টাকা, তাদের মাসে ২০০ থেকে ১০০০ টাকা বেঁচে যাবে। এর ওপরের স্তরে প্রতি ১০ হাজার টাকা বেশি আয়ের ক্ষেত্রে প্রতি মাসে বাঁচবে ৫০০ টাকা। সেই স্তরে করহার ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে যাদের আয় বেশি, তাদের বেশি ছাড় দেওয়া হয়েছে বলেই দেখা যাচ্ছে।

অন্যদিকে সরকারি অনুমোদনহীন পেনশন তহবিলে করারোপ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ব্যাপারটা অন্যায্য দুটি কারণে। দেশে সাধারণত কর্মীদের চাকরিগত সুবিধা নেই। পাশাপাশি করনীতি অনুসারে চাকরি শেষে যেসব সুবিধা পাওয়া যায়, সেগুলো প্রাপ্তি হিসেবে পুঁজির আওতায় পড়ে, রাজস্ব নয়। সে জন্য এটা করযোগ্য নয়। এখন এই প্রস্তাবে ব্যক্তিকে দ্বৈত কর দিতে হবে।

তবে সরকার অনলাইনে কর রিটার্ন দাখিল করলে ২ হাজার টাকা ছাড় দেওয়ার যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার মতো।

অন্যদিকে বাজেটে মোটরগাড়িতে অগ্রিম আয়কর হারে বড় ধরনের বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যাপারটা অসম, কারণ ঢাকা শহরের এ রকম দুর্বল গণপরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ি নিছক বিলাসিতা নয়, প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ২ হাজার সিসির কম ক্ষমতার গাড়িতে এই কর বৃদ্ধি উচিত হয়নি।

কালোটাকা সাদা করার প্রস্তাবে স্টক মার্কেট ও আবাসন খাত চাঙা হতে পারে, কিন্তু এতে অসৎ মানুষকে উৎসাহিত করা হলো।

অন্যদিকে ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক বৃদ্ধির যে প্রস্তাব, তা আমানতকারীদের নিরুৎসাহিত করবে। এমনিতেই এখন ব্যাংক আমানতের সুদহার ইতিহাসের সবচেয়ে কম, সেই সময় এই আবগারি শুল্ক আরোপের প্রস্তাবে আমানত নিরুৎসাহিত হবে।

মোবাইল ফোনের সিম কার্ডের মাধ্যমে প্রদত্ত সেবায় সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে একজন গ্রাহক ১০০ টাকা টপ আপ করলে ভ্যাট-সম্পূরক শুল্কসহ সব মিলিয়ে ২৭ দশমিক ৫ টাকা দিতে হয়, সম্পূরক শুল্ক বাড়লে তা দাঁড়াবে ৩৩ দশমিক ২৫ টাকা। মোবাইল ফোন ব্যবহার এখন মোটেও বিলাসিতা নয়। এটাও আবার এমন সময়ে করা হলো, যখন মানুষের হাতে ব্যয় করার মতো টাকা কম।

করপোরেট কর

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির করপোরেট কর ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। কিন্তু করপোরেট ব্যয়ের সীমা কিছু ক্ষেত্রে কমানো হয়েছে, তাতে এই সুবিধা পুরোপুরি পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। বিদেশ ভ্রমণের ব্যয় প্রদর্শিত টার্নওভারের শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশের বেশি হওয়া যাবে না বলে প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগে ছিল ১ দশমিক ২৫ শতাংশ। পাশাপাশি প্রচারণার খরচও প্রদর্শিত টার্নওভারের শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশের বেশি করা যাবে না। প্রচার-প্রচারণা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার জন্য জরুরি। এসব খাতে খরচ কমানো হলে ব্যবসায় প্রভাব পড়তে পারে। বরং এতে দেখা যাবে, করপোরেট করের কার্যকর হার না কমে বেড়ে যাবে।

বর্তমানে সব আমদানি পণ্যের ওপর ৩ শতাংশ উৎসে কর আরোপ করা হয়। আমদানির ক্ষেত্রে দেখা যায়, কাঁচামালের মূল্য সাধারণত ২৫ শতাংশ বেশি ধরা হয়। তাতে এই অগ্রিম কর দাঁড়ায় কার্যত ৪ শতাংশ। আর বিক্রয় ও আমদানির ক্ষেত্রে উৎস কর হিসাব করা হলে কার্যত অগ্রিম করের হার দাঁড়ায় প্রায় ৯ শতাংশ। বর্তমানে সিমেন্ট, ইস্পাত ও অ্যালয়শিল্পে এই কর আছে, এসব খাতের বেলায় এই করকে চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা অত্যন্ত বৈষম্যপূর্ণ। বর্তমানে যে ধরনের প্রতিযোগিতা, তাতে এই ৯ শতাংশ কর দিয়ে মুনাফা করা কঠিন। তবে বাজেটে ভ্যাটের ওপর অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। কিন্তু এই ব্যবস্থা উৎপাদনশীল খাতকে ব্যাহত করছে। তার নগদ প্রবাহ কমে যাচ্ছে। পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয়ের ওপর আউটপুট ভ্যাটের বিপরীতে এটা সমন্বয় করা যেতে পারে।

পরিশেষে আয়কর আইনের বিতর্কিত ৮২ সি ধারা নিয়ে বলা দরকার। এই আইনে বলা হয়েছে, সব ধরনের অগ্রিম কর বা উৎসে কর ন্যূনতম কর হিসেবে বিবেচিত হবে। এটা রাজস্ব বিভাগের ব্যর্থতা ঢাকার প্রয়াস। অন্যদিকে এটা ধরে নেওয়া হচ্ছে যে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হতে পারে না। কোভিডের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাপারটা মারাত্মক হতে পারে।

মাসুদ খান
প্রধান উপদেষ্টা, ক্রাউন সিমেন্ট

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0