default-image

'১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি অপরাহ্ণে আমার জন্ম। সিলেটের ধোপাদীঘির পাড়ের আমাদের বাড়িতে।  পেশায় আইনজীবী আমার আব্বা আবু আহমদ আবদুল হাফিজ ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য। কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে যাবেন বলে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। আমি শুনেছি,পৃথিবীতে আমার আগমনের কারণে আব্বার সেই যাত্রাটা বন্ধ হয়ে যায়।পরিবারের তৃতীয় সন্তান আমি। ভাই-বোনদের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো আমার বোন। তিনি এখনো জীবিত, বয়স এখন ৯১ বছর।'

ঠিক এভাবেই অকপটে নিজের শৈশবের কথা বলছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গতকাল বৃহস্পতিবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ফেসবুক লাইভ ও ইউটিউব চ্যানেলের নিয়মিত আয়োজন 'আইপিডিসি অগ্রজ'-এর চতুর্থ পর্বে অতিথি ছিলেন তিনি। এক ঘণ্টার এ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট ব্যাংকার ও বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান।

'বাংলাদেশ' নামের বিস্ময় গড়ার গল্প শুনব পথ দেখানো অগ্রজদের কাছেই-এই অভীষ্ট নিয়ে এক মাস আগে অনুষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখা আবদুল মুহিতকে 'বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, গবেষক, লেখক, কূটনীতিবিদ এবং অর্থনীতিবিদ' বলে আখ্যায়িত করেছে আইপিডিসি।

বিজ্ঞাপন
default-image

মুহিত বলছিলেন, নানা ধরনের বই পড়তাম ছোটবেলা থেকেই। কী বুঝতাম না বুঝতাম বলতে পারছি না, তবে বঙ্কিম পড়া শুরু করি ১০ বছর বয়সেই। আর শৈশব কেটেছে নিজেদের বাড়িতেই। বেশি ঘোরা-ফেরা হতো না। বড়জোর মামা-চাচাদের সঙ্গে ঘুরতে বেরোতাম। আমাদের পাড়া ছিল হিন্দু পাড়া। ওই পাড়ায় একটিই মুসলমান পরিবার ছিল, সেটা আমাদের। ফলে হিন্দু ছাত্ররাই ছিল আমার বন্ধু-বান্ধব। পূজা ছাড়া তাদের সব অনুষ্ঠানেই যোগ দিতাম। এমনকি মাঝে মাঝে পূজাতেও যোগ দিতাম। আমরা খুব সৌভাগ্যবান ছিলাম যে আব্বার গাইডেন্স পেয়েছি। আব্বা আইনজীবী ছিলেন ঠিক, কিন্তু মনে-প্রাণে ছিলেন শিক্ষক। শেষ জীবনে তিনি ২১ বছর কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন।

মুহিত বলেন, দাদা খুব পছন্দ করতেন আমাকে। যে বাড়িতে আমার জন্ম হয়, সেটি দাদার মূল বাড়ি থেকে একটু দূরে। প্রত্যেক দিন দাদা আসতেন আমাদের এই বাড়িতে। ঘণ্টাখানেক বসতেন। আর একটি করে পয়সা দিতেন। এক পয়সার তখন অনেক দাম। ৪ থেকে ৫টি লজেন্স পাওয়া যেতো।

নিজের শখ নিয়ে আবদুল মুহিত বলেন, এক সময় খুব টেনিস খেলতাম। বয়সের কারণে ছেড়ে দিয়েছি। অবশ্য আরেকটি কারণও আছে। গরম। উত্তাপ আমার সহ্য হতো না। আর মুন্সিগঞ্জে কলেজে যখন ছিলাম, তখন তাস খেলেছি। অবশ্য বেশি খেলিনি। আর ভালো খাওয়া-দাওয়া পছন্দ করি। বই পড়া ও লেখালেখি পছন্দ করি। ৪৫ হাজার বইয়ের বিরাট সংগ্রহশালা আছে আমার। যদিও সব বই পড়তে পারিনি। পারব বলেও মনে হয় না আর।

বিজ্ঞাপন
default-image

এখন অবশ্য নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটানোকেও নিজের শখের তালিকায় রাখতে চান মুহিত। বলেন, ছোট দুটির সঙ্গে সময় কাটাই। তবে বড় নাতি-নাতনিও আছে আমার। আমার ছোট ছেলে ২৪ বছর বয়সে বিয়ে করেছে। ওর ছেলে-মেয়ে স্নাতক পাস করে গেছে। আরেকজন দারুণ মানুষ আছে আমার পরিবারে। সে হচ্ছে আমার মেয়ে সামিনা। ব্যাংকার ছিল। অতি অল্প বয়সে অবসর গেছে। সে আমার খুব দেখা-শোনা করে। ওর সঙ্গে সময় কাটানোটাও আমার খুব প্রিয়।

আনিস এ খান একটা একটা করে প্রসঙ্গ তুলে আনছিলেন, আবদুল মুহিত প্রায় পুরোটা সময় প্রাণবন্ত হাসি হেসে হেসেই জবাব দিচ্ছিলেন। বিশ্বখ্যাত দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল জানিয়ে বলছিলেন, সিভিল সার্ভিসের সদস্য হিসেবে বৃত্তি নিয়ে ১৯৫৭ সালে তিনি এক বছরের জন্য পড়তে যান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে ১৯৬৩ সালে পড়তে যান হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। মুহিতের স্মৃতিচারণ, হার্ভার্ড আমার জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এনে দেয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্রন্থাগারে কাটাতাম। বহুদিন এমন হয়েছে যে গ্রন্থাগারিক ও আমি একসঙ্গে রাত ১১টায় গ্রন্থাগার ছাড়তাম।'

দুই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে ষাটের দশকের শুরুর দিকে নিজের ২৫ পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ লেখার কথাও স্মরণ করেন আবদুল মুহিত। বলেন, প্রবন্ধ নিয়ে আটজনের একটি দল বৈঠক করে। সবাই দেখলেন যে একটি লাইনও এখানে ফেলে দেওয়ার মতো নয়। একজন পাকিস্তানি সমর্থনও করলেন। কিন্তু তার পর এটা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগেও পাঠানো হলো। সবাই আগ্রহ দেখালেন, এটা নিয়ে এত আলোচনা কীসের? এর পেছনে রহস্য কী? পরে অবশ্য পুরো বিষয়টিই ধামাচাপা পড়ে যায়।

স্বাধীনতার পর পরিকল্পনা কমিশনের সচিব হিসেবে নিয়োগ পেলেও সেখানে তিনি যোগ দেননি বলে জানান মুহিত। বলেন, 'বঙ্গবন্ধু তখন আমাকে একটি সুযোগ দিলেন। বললেন আমি না চাইলে কোনো অসুবিধা নেই, যোগ দিতে হবে না। মহকুমাগুলোকে জেলা করাসহ দুটি বিষয়ে দুটি প্রতিবেদন তৈরি করার দায়িত্ব দিলেন। সময় দিলেন দেড় মাস। নির্দিষ্ট সময়েই প্রতিবেদন দিলাম।'

বিজ্ঞাপন
অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর আমার লক্ষ্য ছিল ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। জানতাম, এ কাজ করতে গেলে আর্থিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে। আমি তাই এ বিষয়ে মনোযোগ দিই।
সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী মারা যাওয়ার পর সিলেটে ২০০১ সালে সংসদ নির্বাচন করার স্মৃতিচারণ করেন মুহিত। বলেন, 'নির্বাচনে আমি হেরে গেলাম। তবে আমার নির্বাচনী এলাকায় এমন দ্বিতীয় কেউ নেই যে আমার চেয়ে এলাকাটা ভালো চেনেন। পায়ে হেঁটে, নৌকায় করে, মোটরসাইকেলের পেছনে বসে পুরো এলাকা চষে বেড়িয়েছি। পরে ২০০৮ সালের নির্বাচনে পাস করি। যদিও প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছিলেন, টেকনোক্র্যাট কোটায় আমি মন্ত্রী হব, ফলে নির্বাচন নিয়ে এত পড়ে আছি কেন?'

আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর আমার লক্ষ্য ছিল ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। জানতাম, এ কাজ করতে গেলে আর্থিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে। আমি তাই এ বিষয়ে মনোযোগ দিই। ৯৫ হাজার কোটি টাকার বাজেটকে আমি ৫ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করতে চেয়েছিলাম। ৪ লাখ ৪০ হাজার পর্যন্ত উঠে পরে বিদায় নিই। আমি মনে করি অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছি।'

এ পর্যন্ত ৩৬টি বই লিখেছেন জানিয়ে আবদুল মুহিত বলেন, বেশির ভাগ বই বেরিয়েছে সময় প্রকাশন থেকে। শেষ দিকে চন্দ্রাবতী একাডেমি থেকে বেরিয়েছে 'সোনালি দিনগুলি' ও 'স্মৃতিময় কর্মজীবন।' প্রয়াত ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের প্রিয় প্রকাশনা সংস্থা ছিল চন্দ্রাবতী একাডেমি। আর প্রথমা প্রকাশন বের করেছে 'স্মৃতি অম্লান'। আমি এখন 'পৃথিবীর ইতিহাস' লিখছি। মনে হচ্ছে ফরিদ আহমেদ (সময় প্রকাশন) আরও তাগাদা দিয়ে বইয়ের সংখ্যা ৪০টি ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে।
সবশেষে আবদুল মুহিত বলেন, 'জীবনটা আল্লাহর মেহেরবানি। জ্ঞান আহরণ করলেই জীবনে আনন্দ পাওয়া যায়। জ্ঞানের সাগরে একটুখানি ডুবে যাওয়ার মধ্যেই পাওয়া যায় পরম তৃপ্তি।'

মন্তব্য পড়ুন 0