default-image

প্রথম আলো: গত বছরের মার্চে যখন দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হলো, তখন কী ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছিল?

সৈয়দ শাফাত উদ্দিন আহমেদ: করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে গেল। একের পর এক দেশের ভেতরে ও বাইরে ভ্রমণের বুকিং বাতিল করতে থাকলেন পর্যটকেরা। তখন গ্রাহকদের তাৎক্ষণিকভাবে উড়োজাহাজ ও হোটেলের অগ্রিম বুকিংয়ের অর্থ ফেরত দিতে হলো আমাদের। কিন্তু এয়ারলাইনসগুলো আমাদের টাকা ফেরত দিতে অনেক সময় নিল। অন্যদিকে হোটেলমালিকেরাও টাকা ফেরত দিলেন না। তাঁরা বললেন, পরে যখন আমাদের গ্রাহকেরা হোটেলে যাবেন, তখন টাকা সমন্বয় করা হবে। এয়ারলাইনস ও হোটেলমালিকদের অসহযোগিতার কারণে আমাদের অনেক টাকা আটকে গেল। অন্যদিকে মাসের পর মাস ব্যবসা বন্ধ থাকল। মে পর্যন্ত কর্মীদের বেতন দেওয়ার চেষ্টা করলাম। তত দিনে পুঁজি শেষ। বাধ্য হয়ে কর্মীদের বিনা বেতনে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম।

প্রথম আলো: করোনার মধ্যেই তো পর্যটন শুরু হলো। প্রচুর মানুষ কক্সবাজারসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় যাচ্ছে। বর্তমানে ব্যবসা কি কিছুটা ভালোর দিকে রয়েছে?

সৈয়দ শাফাত উদ্দিন আহমেদ: করোনা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর গত অক্টোবর থেকে কক্সবাজার, সুন্দরবনসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় মানুষজন যেতে শুরু করে। সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য আমরা অনেক পর্যটকের ট্যুর আয়োজন করেছি। তবে কক্সবাজারে পর্যটকদের ভালো চাপ থাকলেও ব্যবসা সেভাবে হচ্ছে না। কারণ, হোটেলমালিকেরা আগ্রাসী বিপণন করছেন। দেশীয় এয়ারলাইনগুলো হোটেলসহ প্যাকেজ বানিয়ে ব্যবসা করছে। বিভিন্ন ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড ব্যবহারে এয়ারলাইনস ও হোটেলে মূল্যছাড় দিচ্ছে। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছি না আমরা। ফলে আমাদের ব্যবসার জায়গাটি ছোট হয়ে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: দেশের বাইরের ভ্রমণ আয়োজনই আপনাদের আয়ের বড় উৎস। বিধিনিষেধের মধ্যেও মানুষ কি যাচ্ছে। সেখানে ব্যবসা কেমন?

সৈয়দ শাফাত উদ্দিন আহমেদ: বিদেশে ভ্রমণ আয়োজনে বেশি আয় হয় কথা সত্য। কিন্তু করোনার কারণে জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোয় মানুষ যেতে পারছে না। সাম্প্রতিক সময়ে মহামারির টিকা ও ভ্রমণের জন্য দুবাইয়ে যাচ্ছেন বিত্তবানেরা। তবে সেই সংখ্যা কম। ভারতে চিকিৎসা ও ব্যবসার কাজে মানুষ যাচ্ছে। কিছু ব্যবসা পাচ্ছি। গত বৃহস্পতিবার থেকে নেপালের দ্বার খুলেছে। অনেকে খোঁজখবর নিচ্ছে। আর মিসর, শ্রীলঙ্কা, তুরস্ক ও মালদ্বীপ যাওয়ার সুযোগ থাকলেও উড়োজাহাজ ভাড়া বেশি হওয়ায় খুব একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে বিদেশে ভ্রমণ আয়োজনের ব্যবসাও ভালো না।

প্রথম আলো: তাহলে ব্যবসা কীভাবে টিকিয়ে রেখেছেন?

সৈয়দ শাফাত উদ্দিন আহমেদ: আগে আমরা দেশের মধ্যে ভ্রমণ আয়োজন করতাম। তাতে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যবসা করতাম। বাকি সময় খুব একটা কাজ থাকত না। গত পাঁচ-ছয় বছরে মানুষজনের বিদেশ ভ্রমণ ব্যাপক হারে বেড়েছে। সে কারণে আমাদের ব্যবসার পরিধি বেড়েছে। কর্মী ও পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। হঠাৎ করে করোনা সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। ব্যবসা তলানিতে নামলেও অফিস ভাড়া ও কর্মীদের বেতন দিতে হবেই। সে জন্য করোনাকালে খাঁটি মধু, ঘি, দুধ, শর্ষে তেল ইত্যাদি অনলাইনে বিক্রি শুরু করি। কারণ, সারা দেশে ভ্রমণের কারণে কোথায় কোন জিনিসটা ভালো পাওয়া যায়, সেটি আমরা জানি।

প্রথম আলো: সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে কি ঋণ পেয়েছেন?

সৈয়দ শাফাত উদ্দিন আহমেদ: আমরা অনেক চেষ্টা-তদবির করেও কোনো প্রণোদনা পাইনি। পর্যটনশিল্পকে গুরুত্বপূর্ণ খাত মনে করে না সরকার। তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতি সরকারের সব নজর। তবে একটু সহযোগিতা পেলেই পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারত। এখনো যদি উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে যেটুকু ক্ষতি হয়েছে সেখানে থামানো যাবে। ধ্বংসের হাত থেকে পর্যটন খাত বেঁচে যাবে।

প্রথম আলো: করোনার সংকট আরও দীর্ঘ হলে কি ব্যবসায় টিকে থাকতে পারবেন?

সৈয়দ শাফাত উদ্দিন আহমেদ: পর্যটন খাতের সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের অধিকাংশ দেশ ও পর্যটনকে ভালোবেসেই ব্যবসা করে। সে কারণেই সবাই বিভিন্নভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করে। আমরাও করব। আগামী দিনে ব্যবসা টেকসই করতে আমরা দেশের ভেতরে নতুন নতুন দর্শনীয় স্থান জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছি। সরকার যদি ট্যুর অপারেটরদের জন্য একটি নীতিমালা করে, তাহলে আমাদের সহজেই ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হতো। সেই নীতিমালায় এয়ারলাইনসের হোটেল ভাড়াসহ প্যাকেজ ও ব্যাংকগুলোর কার্ডে মূল্যছাড় বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

সৈয়দ শাফাত উদ্দিন আহমেদ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মার্কেট এন–ট্রান্স লিমিটেড

বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন